প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নিলামওয়ালা ছ-আনা থেকে শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী

পলাশ শরিফ: ১৩ বছর বয়সে ১৬ টাকা নিয়ে এক কিশোর চেপে বসে ট্রেনে। গ্রাম ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয়। সময়টি ১৯৪২ সাল।

বিশাল কলকাতা শহরে ছোট্ট এক কিশোর, কোথাও আপন বলে কেউ নেই। তবে বুকভরা সাহস আর আত্মবিশ্বাসই ছিল সম্বল। সেই শহরে শিয়ালদহ রেলস্টেশনেই ঠাঁই হয় তার। সেখানে কেটে যায় অনেকদিন। কোনো কোনো দিন একবেলা ছাতুর ব্যবস্থা হলেও, দু-এক বেলা না খেয়েই কেটেছে তার। কখনও প্লাটফর্মে কাগজ বিছিয়েও ঘুমিয়েছে। তবু দমেনি। সীমাবদ্ধতার মাঝেও স্বপ্নের জাল বুনেছে প্রতিনিয়ত।

রেলস্টেশনে থাকতেই শিয়ালদহের জাকারিয়া হোটেল মালিকের সঙ্গে পরিচয়-সখ্য। পরে সেখানেই আশ্রয় হয় তার। এরপর আবারও ১৬ টাকা পুঁজি নিয়ে পাইকারি বাজার থেকে কমলালেবু কিনে হাওড়া ব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় ফেরি করতে শুরু করে।

গ্রাম ছেড়ে অল্প বয়সে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমানো কিশোর সেখ আকিজ উদ্দিন। দেশের অন্যতম শিল্প গোষ্ঠী আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার মধ্যডাঙ্গা গ্রামে তার জš§। বাবা সেখ মফিজ উদ্দিন ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বাবা নিজ গ্রামে ফসলের মৌসুমি ব্যবসা করতেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মা-বাবার একমাত্র সন্তান হয়েও আকিজ লেখাপড়ার সুযোগ পাননি।

তবে দারিদ্র্যকে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন। তাই সেই কিশোর বয়সে কলকাতায় কমলালেবু বিক্রির জমানো টাকায় একটি ভ্রাম্যমাণ দোকান দেন। ভ্যানগাড়ির ওপরে। ব্যবসার পদ্ধতিও ছিল অভিনব। ভ্রাম্যমাণ ওই দোকানে সব পণ্যের নির্ধারিত দাম ছিল ‘ছ-আনা’। দোকানের জুতসই একটা নামও দেন, ‘নিলামওয়ালা ছ-আনা’।

ভালোই চলছিল দোকান, একদিন অবৈধ দখলদারিত্বের অভিযোগে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। তিনদিনের জেল হয়, সঙ্গে পাঁচ টাকা জরিমানা। এর মধ্য দিয়েই সেই দোকানের পরিসমাপ্তি, ফের অনিশ্চয়তা।

আবারও কিছুদিন কলকাতার পথে পথে ঘোরাঘুরি, খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা। একদিন পেশোয়ারের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হয় আকিজ উদ্দিনের। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে পেশোয়ারে চলে যান। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে পশতু ভাষা রপ্ত করে আবারও শুরু করেন সেই ফলের ব্যবসা। সেবার দুই বছরে লাভ করেন ১০ হাজার টাকা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিরে আসেন বাড়িতে, খুলনায়। গ্রামগঞ্জে ঘুরে ধান, পাট, নারকেল ও সুপারি কিনে আড়তে আড়তে বিক্রি শুরু করেন। এভাবে অল্প কিছু টাকা জমিয়ে বাড়ির পাশে বেজেরডাঙ্গা রেলস্টেশনের কাছে একটি দোকান দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই দোকানটি আগুনে পুড়ে যায়। আবারও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। তবে এলাকাবাসীর সহায়তায় ফের দোকান বসান। একই সঙ্গে চালাতে থাকেন ধান, পাট, চাল ও ডালের ব্যবসা। পরে সুপারির ব্যবসায় হাত দেন। দিনভর পরিশ্রমের পর স্ত্রীকে নিয়ে রাত জেগে সুপারি ছিলে কলকাতায় পাঠাতেন। সুপারির ব্যবসায় বেশ মুনাফা অর্জন করেন।

১৯৫২ সালে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাবা বিড়ি ব্যবসায়ী বিধূ ভূষণের সহযোগিতায় বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। যশোর জেলায় নাভারনের নামকরা ব্যবসায়ী মুজাহার বিশ্বাসের পরামর্শে ছোট্ট একটি বিড়ি তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আকিজ গ্রুপের কর্ণধার সেখ আকিজ উদ্দিনকে। শুরু হয় তার উত্থান।

বিড়ি ব্যবসার ওপর ভর করে বদলে যেতে শুরু করে তার জীবনের গতি-প্রকৃতি। এরপর যে ব্যবসায়-ই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফল হয়েছেন। ১৯৬০ সালে যশোরের অভয়নগরে অত্যাধুনিক চামড়ার কারখানা এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ১৯৬৬ সালে ঢাকা টোব্যাকো, ১৯৭৪-এ আকিজ প্রিন্টিং, ১৯৮০ সালে আকিজ ট্রান্সপোর্ট ও নাভারন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠা করেন। জেস ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৮৬ সালে। ১৯৯২-এ আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। এরপর ১৯৯৪ সালে আকিজ জুট মিল তৈরি করেন। পরের বছর আকিজ সিমেন্ট ও আকিজ টেক্সটাইল নিয়ে আসেন। ১৯৯৬ সালে  তৈরি করেন আকিজ পার্টিক্যাল। ১৯৯৭-এ বিনিয়োগ করেন আবাসন খাতে গড়ে তোলেন আকিজ হাউজিং। ১৯৯৮ সালে সাভার ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরির পর এক বছর বিরতি নিয়ে ২০০০ সালে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের পাশাপাশি আকিজ অনলাইন ও নেবুলা ইন্ক প্রতিষ্ঠা করনে। ২০০১ সালে আকিজ করপোরেশন, আকিজ কম্পিউটার ও আকিজ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড টেকনোলজি স্থাপন করেন। ২০০৪ সালে আফিল এগ্রো ও ২০০৫ সালে আফিল পেপার মিলস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ২৩টি শিল্প-কারখানার সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ‘ব্যবসার জাদুকরে’ পরিণত হয়েছেন সেখ আকিজ উদ্দিন। তার গড়া প্রতিষ্ঠানে ৩২ হাজার মানুষ কর্মরত।

সাহস, সততা আর কঠোর পরিশ্রম-ই ওই মানুষটিকে সফল করেছে। তার কারণেই দেশ ও অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখছে আকিজ গ্রুপ।