মত-বিশ্লেষণ

নিষিদ্ধ পলিথিন বাজারে থাকে কীভাবে?

সাধন সরকার: খুলনা শহরজুড়ে দেদার চলছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ। প্রশ্ন হলো, খুলনা শহরের কোথায় পাওয়া যাচ্ছে না পরিবেশের শত্রু বনে যাওয়া এই নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ? শহরের সর্বত্রই পলিথিনের ছড়াছড়ি। বড় বড় শপিংমল, শহরের অলিগলির দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কাঁচাবাজার, মাছ-মাংসের বাজার, ছোট-বড় মুদি দোকান, বইয়ের দোকান, ফলের দোকানসহ বিভিন্ন জায়গায় পলিথিনের ছড়াছড়ি। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাব, গাফিলতি ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পলিথিন উৎপাদন, বাজারজাতকরণ করে ফায়দা নিচ্ছেন এবং সার্বিক পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় বটে, কিন্তু অভিযান অনিয়মিত, পাটের ও কাগজের বা বিকল্প কোনো ব্যাগ জনপ্রিয় না হওয়ার কারণে পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার থামছে না। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে পলিথিন ব্যাগ এবং এটি সহজে বহনযোগ্যও বটে! প্রশ্ন হলো, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ প্রকাশ্যে বিস্তারের দায় কার? জনসাধারণকে এর জন্য দায়ী করা মোটেও সমীচীন হবে না। পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, আমদানি এবং বিক্রয়ের সঙ্গে যারা জড়িত, এ দায় তাদের। পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে যারা বা যেসব কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে, এ দায় তাদের। বাজারের দোকানদার বা বিক্রেতা সহজেই ক্রেতার নিত্যপণ্য পলিথিনে ভরে দিচ্ছেন। তাছাড়া পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে এমন সহজলভ্য ও সস্তা কোনো ব্যাগের সন্ধান জনসাধারণ পর্যায়ে এখনও সেভাবে পৌঁছায়নি। ফলে খোলাখুলিভাবে চলছে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। আমরা পলিথিন ব্যাগকে পরিবেশের শত্রু বলে গণ্য করে থাকি। আর এই শত্রু প্রতিদিন আমাদের ঘরে ঢুকছে। পলিথিন ব্যাগ শহরের জলাবদ্ধতা ও কৃষিজমিতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। কাজগের ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ কিংবা পাটের ব্যাগ সহজপ্রাপ্য ও কম দাম না হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই পরিবেশবান্ধব এসব ব্যাগ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

অপচনশীল ও ‘অমর’ এই পলিথিন ব্যাগ যেখানে-সেখানে মাটিতে অক্ষত অবস্থায় থেকে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে ফেলে। এটি শহরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। ফলে পানি দূষণসহ নানা রোগের বিস্তার ঘটছে। পলিব্যাগ জমে নগরীর স্যুয়ের, স্টর্ম স্যুয়ের, নালা-নর্দমাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পলিথিন ব্যাগ স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ। পলিথিনে খাদ্যদ্রব্য রাখলে তা দ্রুত রাসায়নিক বিষক্রিয়া তৈরি করে। ময়লার ভাগাড়ে কিংবা উš§ুক্ত স্থানে পলিথিন ব্যাগ পোড়ানোর দৃশ্যও এখন চোখে পড়ে। এর ফলে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা পরিবেশ ও সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো হুমকি। পলিথিন ব্যাগ কোথায় উৎপাদন হয়, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে কারা জড়িত একটু খোঁজ-খবর নিলেই তা জানা অসম্ভব নয়। পরিবেশবাদী সংগঠনের আন্দোলনের মুখে ১৭ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২ সালে আইন করে সারা দেশে সব ধরনের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় (তবে রেণুপোনা পরিবহন ও পণ্যের মোড়ক হিসেবে একটু মোটা প্লাস্টিকের মোড়ক বৈধ)। এ ব্যাপারে আইন থাকলেও ক্রেতা-বিক্রেতা কারও-ই কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! ফলে পলিথিনের ব্যবহার কখনও থামেনি! পলিথিন ব্যাগের বিস্তার রোধে সবার আগে উৎপাদন কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। উৎপাদন বন্ধ করলে বিক্রেতা-ক্রেতা পর্যায়ে এগুলো পৌঁছাবে না। সঙ্গে সঙ্গে অন্য পরিবেশবান্ধব ব্যাগ যেমন কাগজের ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ, পাটের ব্যাগ ব্যবহারে জনসাধারণকে সচেতন ও উৎসাহিত করতে হবে। 

খুলনা শুধু জেলা শহর নয়, বিভাগীয় শহরও বটে। দক্ষিণাঞ্চলের এই সুন্দর শহরে পলিথিনের ব্যবহার তো থামানো যাচ্ছেই না, আবার শহরের আনাচে-কানাচে পলিথিন পুড়িয়ে উপজাত হিসেবে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হচ্ছে। ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া।

পরিবেশবান্ধব ব্যাগ বাজারে থাকলেও সস্তায় পলিথিন ব্যাগ পাওয়ার কারণে জনসাধারণ এগুলো ব্যবহার করে না! তাই পাটের ব্যাগের দাম নাগালের মধ্যে আনতে হবে। শুরুতে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে ও জনপ্রিয় করতে দরকার হলে এর ওপর ভর্তুকি দিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের শাস্তি দুই বছরের জেল বা দুই লাখ টাকা জরিমানা। একসঙ্গে দুটি দণ্ডও হতে পারে। আবার বিক্রি, প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা ব্যবহারের অপরাধে শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা দুটোই। কত সুন্দর ও সময়োপযোগী আইন আছে, অথচ এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। বাস্তবিক পক্ষে এই আইন  মূলত উৎপাদনকারী, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জানা আছে বলে মনে হয় না। জানা থাকলে আইনের ভয়ে অন্তত প্রকাশ্যে পলিথিনের ব্যবহার করা হতো না। জনসাধারণের মধ্যে পলিথিনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত ও সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের পাশাপাশি সব ধরনের গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা পরিবেশ রক্ষার দায় কারও একার নয়, আমাদের সবার।

কলাম লেখক

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..