প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে খেলাপি ঋণ

‘তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা’ শিরোনামে যে খবর ছাপা হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা আমাদের কোনো শুভবার্তা দেয় না। ঋণ দিলে খেলাপি হবেই, এ বাস্তবতা মাথায় রেখেও অবলীলায় বলা যায় আমাদের খেলাপি ঋণের সামগ্রিক পরিস্থিতি দুশ্চিন্তার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার ঋণ। আর এরই মধ্যে খেলাপি হয়েছে তার প্রায় ১১ শতাংশ অর্থাৎ ৮০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। আরও ভীতিপ্রদ তথ্যÑকেবল চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। খেলাপি ঋণের এই যে বৃহৎ চিত্র, তাতে আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অংশীদারত্ব বেশি। দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর  শেষে তাদের বিতরণকৃত মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৩০ শতাংশের মতো। এখানে কেউ কেউ হয়তো যুক্তি দেখাবেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ জোগায় বেশি; ফলে তাদের খেলাপি বেশি হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। উপেক্ষা করা যায় না এমন বক্তব্য। এখান থেকে অবশ্য আরেকটি ঘটনার জুতসই ব্যাখ্যা মেলে না। সেটি হলো, যে সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ৩৮ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে (যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৯ দশমিক ২৫ শতাংশ), সে একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকল কীভাবে? উল্লেখ্য, বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি হওয়া ঋণ পরিমাণের দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাছাকাছিÑআনুমানিক ৩৪ হাজার কোটি টাকা। পার্থক্য কেবল উক্ত সময়ে তারা যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, সেখান থেকে খেলাপি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় কমপক্ষে চার-পঞ্চমাংশ বা ৮০ শতাংশ কম!

এ আলোচনায় ইচ্ছাকৃতভাবেই বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ক’মাস আগে বন্যায় দেশের কৃষি খাত লক্ষণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে কৃষিতে সহজে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তাই এ আলোচনায় এদের উদাহরণ টানাটা অসঙ্গত বলেই প্রতীয়মান; যদিও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ইস্যু উত্থাপিত হলে ওইসব ব্যাংকের দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করতে হতে পারে। কথা হলো, মোট ঋণের সঙ্গে খেলাপি ঋণের এই যে আনুপাতিক ব্যবধান সেটিই প্রমাণ করে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন পরিস্থিতি নাজুক। এ বিষয়ে নজর দিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুনয় পর্যন্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেসবের সাড়া মোটা দাগে হতাশাজনক বলেই মনে করেন অনেকে। তাদের এও ধারণাÑবারবার পরামর্শ দিয়েও সুফল না পেয়ে, হতাশ হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতো ব্যক্তিরা এখন বলছেন পুরোনো ঋণগুলো ‘রি-শিডিউলিং’ করেও যখন কাজ হচ্ছে না, তখন আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে ঋণখেলাপিদের জামানতই বাজেয়াপ্ত করা হোক। বাস্তবে এ কৌশল কতটা কাজে দেবে, আমাদের জানা নেই। তবে নীতিনির্ধারকরা যদি তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বিরক্তি আর ক্ষোভকে হালকাভাবেও আমলে নেন, তাতেও কিছুটা কাজ হওয়ার কথা। সমস্যা হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সংঘটিত অনিয়ম নিয়ে সামান্য সমালোচনা হলেও কারও কারও গায়ে যেন ফোস্কা পড়ে। আমরা চাইব, সংশ্লিষ্ট সমালোচনাগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করুক সরকার। আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের কোনো উপকারেই আসছে না, তারা কেবল খেলাপি ঋণ আর প্রভিশন ঘাটতি বাড়িয়ে চলেছে এমন অভিযোগ যৌক্তিক কেউ তুলবেন না। তবে কথা হলো, এদের অভ্যন্তরীণ সুশাসন জোরদার হলে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ উপকৃত হতেন। সে দৃষ্টিকোণ থেকেও খেলাপি ঋণের লাগাম হাতে রাখা কি জরুরি নয়? আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দিকে যাওয়ার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণে আর দেরি করা উচিত হবে না।