প্রচ্ছদ শেষ পাতা

নীতিমালা কার্যকর করতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক

ঋণ-আমানতের সুদহার ব্যবধান

শেখ আবু তালেব:ব্যাংকে রাখা আমানত ও গ্রাহককে দেওয়া ঋণের সুদহার ব্যবধান (স্প্রেড) নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১২ সালে ঠিক করে দেওয়া এ হার সময় সময় পরিবর্তন করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে এলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ব্যবধান মানছে না দেশের অধিকাংশ ব্যাংক। নিয়ম ভাঙায় বরাবরই এগিয়ে রয়েছে দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলো। অপরদিকে দেশীয় বেসরকারি খাতের ২০ ব্যাংক এ হার মানছে না। এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৭ ব্যাংক এই হার মানছে না। অবশ্য ব্যাংকাররা বলছেন, সুদহার ব্যবধান নির্ধারণের প্রক্রিয়া ও সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। নইলে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন অনেকেই, বিশেষ করে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষরা।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলো লাগামহীনভাবে ও ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে আসছিল। এতে ব্যাংক খাতে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টিসহ পুরো ব্যাংক খাতে অস্থিরতা তৈরি করে। তখন ব্যাংকগুলোকে আমানত ও ঋণের মধ্যে সুদহার ব্যবধান নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাপারে ২০১৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর সার্কুলার দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়, ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্যান্য খাতে স্প্রেড নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থাকতে হবে।
গত বছরের মে পর্যন্ত এ ব্যবধান ছিল পাঁচ শতাংশ। ২০১৮ সালের ৩০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যবধান চার শতাংশ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। অর্থাৎ, দেশে কার্যরত কোনো ব্যাংক সর্বোচ্চ যে সুদহারে আমানত সংগ্রহ করবে, তার সঙ্গে সর্বোচ্চ চার শতাংশ সুদ যোগ করে ঋণ দিতে পারবে। এ হিসেবে কোনো ব্যাংক ১০ শতাংশ সুদে আমানত নিলে ব্যাংকটির ঋণ সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। অবশ্য ভোক্তা ও সব ধরনের কার্ডের সুদহারের বেলায় এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।
কিন্তু দেশের বেসরকারি খাতের ২০ ব্যাংক এ নীতিমালা মানছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া ব্যাংকগুলোর সর্বশেষ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঋণ-আমানত সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) হচ্ছে আট দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এছাড়া এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ, সম্প্রতি ব্যাংকসেবা চালু করা বিজিবির মালিকানাধীন সীমান্ত ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ৩৪ শতাংশ, দি সিটি ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের চার দশমিক ৯৬ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) চার দশমিক ৬১ শতাংশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকৃত হারের চেয়ে ঋণ বিতরণে বেশি সুদ নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ৫৭ ব্যাংকের তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
স্প্রেড নির্ধারিত সীমার সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে রয়েছে বিদেশি ধারার ব্যাংকগুলো। এতে প্রথম অবস্থানে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ব্যাংকটির আমানত সংগ্রহে গড় সুদহার হচ্ছে এক দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু ঋণের গড় সুদহার হচ্ছে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ব্যাংকটির স্প্রেড হয়েছে আট দশমিক ৭২ শতাংশীয় পয়েন্ট। ভোক্তা ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বাদ দিলে স্প্রেড দাঁড়ায় আট দশমিক ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা গত জানুয়ারিতে ছিল সাত দশমিক ৫১ শতাংশীয় পয়েন্টে। এটি বরাবরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বীকৃত সীমার চেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আর. এফ. হোসেন বলেন, স্প্রেড নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পদ্ধতির মিল নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ব্র্যাক ব্যাংকের স্প্রেড হচ্ছে সাত শতাংশের ওপরে। কিন্তু আমাদের হিসাবে তা ছয় শতাংশ। কয়েকটি খাতের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণের সুদহার বেশি। আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলেছি, এ ঋণের সুদহার বাদ দিয়ে স্প্রেড নির্ধারণ করতে। এটি করলে অনেক ব্যাংকের স্প্রেড সীমা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকেই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, রিটেইল ব্যাংকিংয়ের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ঋণ কি এর আওতায় পড়বে? এ-জাতীয় কিছু সংজ্ঞাগত পরিবর্তনও আনা প্রয়োজন।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খাতগুলো বিভিন্ন ধরনের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পায়। এজন্য এসএমই খাতের সুদহার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর সুদহার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে দাবি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এজন্য গত বছরের এপ্রিলে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর কথা বলেছিলেন। সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়ে চারটি সুবিধা নিয়েছিলেন ব্যাংক উদ্যোক্তারা। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনও পুরোটা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন স্প্রেড নির্ধারণেও ব্যাংকগুলো নির্দেশনা মানছে না।
অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, সব ঋণের বেলায় যে স্প্রেড সীমা মানছে না, তা নয়। উৎপাদন ও এসএমইতেও এ সীমা মানছে না ব্যাংকগুলো। বিষয়টি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অপরদিকে এ নির্দেশনা মানতে এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। বরাবরই এসব ব্যাংক স্প্রেড বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত সীমার মধ্যেই রয়েছে।
ভোক্তা ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া স্প্রেড সীমার ওপরে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক এনএ আট দশমিক ৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট, এইচএসবিসির ছয় দশমিক ৩৬ শতাংশ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার পাঁচ দশমিক ৫২ শতাংশ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন চার দশমিক ৯৪ শতাংশ, উরি ব্যাংক ছয় দশমিক ৮৭ শতাংশ, এইচএসবিসি ছয় দশমিক ৩৬ শতাংশ ও ব্যাংক আল-ফালাহ্ পাঁচ দশমিক ৫৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডের পাঁচ দশমিক ৩৩, আইএফআইসির চার দশমিক পাঁচ, উত্তরা ব্যাংকের চার দশমিক ৬৭, সীমান্ত ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ৩৪, ইবিএল চার দশমিক ৬১, প্রাইম ব্যাংক চার দশমিক ৮২, প্রিমিয়ার ব্যাংক চার দশমিক ৮৮, ট্রাস্ট ব্যাংক চার দশমিক ৪৩, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক চার দশমিক ৯৬, যমুনা ব্যাংকের চার দশমিক ৬৩, মিডল্যান্ড ব্যাংকের চার দশমিক ১৮, এনআরবি ব্যাংকের চার দশমিক ২১, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চার দশমিক ২৭, মধুমতি ব্যাংকের রয়েছে চার দশমিক ৭৫ ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের চার দশমিক ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট।

সর্বশেষ..