দুরে কোথাও

নীলরাজ্য সেন্টমার্টিন’স দৃষ্টি দিতে হবে পরিবেশে

 

 

এ বছরের পর্যটন মৌসুমে অক্টোবরের শুরু থেকে টেকনাফ সংলগ্ন মিয়ানমার সীমান্তে চলছে উত্তেজনা। নাফ নদীর তীরবর্তী কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে কিছুদূর পরপরই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি চলছে। অথচ টেকনাফ শহরের আগে এ সড়কের ওপর অবস্থিত দমদমিয়া ঘাটে সকাল ৮টার পর থেকে প্রতিদিন প্রচুর ভিড়। সেন্টমার্টিনসের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ক্রুজ জাহাজগুলোতে ওঠার জন্য ভিড় করেন পর্যটকরা। সীমান্তে উত্তেজনার কোনো প্রভাব নেই তাদের মনে। টেকনাফের দমদমিয়া এলাকার ঘাটগুলো থেকে প্রতিদিন পাঁচটি জাহাজ ছেড়ে যায় সেন্টমার্টিনসের উদ্দেশে। প্রতিটি জাহাজ গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিনশ পর্যটক নিয়ে যায় দেশের সর্বদক্ষিণের পর্যটন দ্বীপটিতে।

imagesসেন্টমার্টিন’স হচ্ছে নীলের রাজ্য নীল আকাশ আর সমুদ্রের নীল পানি যেন মিলেমিশে একাকার। দ্বীপটির পূর্বদিকে মিয়ানমারের পর্বতমালায় দৃষ্টি আটকে গেলেও অন্য তিন প্রান্ত যেন নীল রঙের সীমানাবিহীন ক্যানভাস। খোলামেলা বালুকাময় সমুদ্রসৈকত আর সমুদ্রের বিরামহীন গর্জন যেন নীল রঙের মায়াময় রাজ্যে পরিণত করেছে সেন্টমর্টিন’সকে।

দমদমিয়া ঘাট থেকে চালু হওয়া সবচেয়ে পুরনো জাহাজ সার্ভিস কেয়ারী সিন্দাবাদের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহ আলম জানালেন, প্রতি বছরের মতো এবারও পর্যটকদের সমান ভিড়, প্রতি ট্রিপে ধারণক্ষমতার পুরোটাই পর্যটকে পূর্ণ থাকে। সীমান্ত সমস্যার তেমন প্রভাব নেই পর্যটকদের মধ্যে, মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া খারাপ থাকায় সেন্টমার্টিনসে পর্যটক যেতে পারেনি, দুই ঈদের সময়ও আবহাওয়া খারপ ছিল, তখন প্রশাসনের নির্দেশে জাহাজ চলাচল বন্ধ রখাতে হয়েছিল।

maxresdefaultটেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী এখানে প্রতি বছর বেড়াতে আসা পর্যটকের সংখ্যা চার লাখের বেশি। ২০০৬ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটময় এলাকা ঘোষণা করা হয়। এক দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এর পরিবেশ রক্ষায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেশ রক্ষায় দৃষ্টি দিতে হবে

দ্বীপে বেড়াতে আসা পর্যটকরা বলছেন, উপযুক্ত তত্ত্বাবধান না থাকায় ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠছে এর পরিবেশ। পরিবেশ অধিদফতর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কিছু পদক্ষেপ নিলেও দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণœ রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বেশ সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

এই দ্বীপে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত দোকানপাট, হোটেল ও রিসোর্টের কারণে নির্মল পরিবেশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা থেকে আসা ব্যাংকার দম্পতি আসিফ ও মোহনা বলেন, নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিরক্তি তৈরি করছে।

সেন্টমার্টিনসের পশ্চিম সৈকতে প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত সমুদ্র নিবাসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ পাপন বলেন, এখানে পাকা ভবন স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্যার (হুমায়ূন আহমেদ) শুধু কটেজ বানিয়েছেন অথচ অনেকে পাকা ভবন নির্মাণ করে দিব্যি ব্যবসা করছেন। এখানে যত্রতত্র মাছের দোকান, শুঁটকির দোকান বসানো হয়েছে।

2015_11_25_15_16_23_mixloxsr9zsvlewurqo7ct1nmfhswt_originalছোট দ্বীপটিতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে একের পর এক ভবন। নেই কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দ্বীপের মাঝখানের ডোবাটি ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে পরিপূর্ণ। সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। বছর দুয়েক আগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজন বিচকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করলেও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনো কাজই হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা।

বেসরকারি হোটেল অবকাশের মালিক নুর আলম ভোলা জানান, আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের সমস্যা হচ্ছে।

দ্বীপে প্রায় অর্ধশত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে পরিবেশ দফতর। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিত হওয়ার পর সেখানে ছাদসহ পাকা দালান নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও সেখানে যে কয়টি বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে, তার বেশক’টি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয়রা পাকা দালান করতে পারে না অথচ ঢাকা থেকে এসে প্রভাবশালীরা দালান নির্মাণ করছেন, স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।

সেন্টমার্টিন’স ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবু বক্কর ছিদ্দিক অভিযোগের সুরে বললেন, পর্যটকরা দুদিনের জন্য আসেন, পরিবেশ নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথাও নেই।

পরিবেশ আধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মাসুদ করিম বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্টমার্টিন’স সরকারের বিশেষ মনিটরিংয়ের আওতায় থাকলেও এর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে যথাযথ প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরও সময়ের প্রয়োজন। কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, এসব বাস্তবায়ন হলে সেন্টমার্টিন’স আগের অবস্থানে ফিরে যাবে, ব্যক্তিমালিকানার স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

 

images-1ছেড়া দ্বীপ, যেখানে সবাই সাদ্দামের অতিথি

সমুদ্রে জোয়ারের সময় সেন্টমার্টিনসের দক্ষিণ প্রান্তের কিছু অংশ মূলদ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন অংশ ছেড়া দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। ছেড়া দ্বীপের একমাত্র পরিবার সাদ্দাম হোসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটন মৌসুমে সেখানে থাকেন। হোটেল অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ছেড়া দ্বীপে পর্যটকরা রাতযাপন করেন না। তারপরও কোনো পর্যটক তাঁবু খাটিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে রাতযাপন করতে হলে তাদের খাবার সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে থাকে সাদ্দামের পরিবার।

সাদ্দাম হোসেন জানান, পর্যটকদের আগমন উপলক্ষে তারা ছেড়া দ্বীপে চলে আসেন। বছরের কয়েকটি মাস এখানে থাকেন। আবহাওয়া খারাপ হলে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেন্টমার্টিনসে চলে যান তারা।

২০ বছর ধরে সাদ্দামের পরিবারই ছেড়া দ্বীপের একমাত্র সেবাদানকারী। ১৯৯৪-৯৫ সালে চিত্রনায়িকা মৌসুমী ও প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ অভিনীত ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমার শুটিং চলাকালে শুটিং টিমের সঙ্গে কাজ করার জন্য সাদ্দামের বাবা হোসেন আলী ছেড়া দ্বীপে আসেন। তখন থেকে এ পরিবারটি ছেড়া দ্বীপের পর্যটকদের একমাত্র সেবাদাতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১১ সালে হোসেন আলী মারা গেলেও তার ছেলে পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

সমুদ্রে ভাটার সময় সেন্টমার্টিনসের অনেক পর্যটক সাইকেল চালিয়ে আসেন ছেড়া দ্বীপে। সাইকেল চালিয়ে ছেড়া দ্বীপে আসা রাজধানী ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আইয়ুব জানান, এখানে আনলিমিটেড সমুদ্রসৈকত, যা সেন্টমার্টিন’সকে বাংলাদেশের অন্যসব পর্যটন এলাকা থেকে আলাদা করেছে। দেশের অনেক পর্যটন এলাকায় গেছি, এটার তুলনা হয় না। সেন্টমার্টিন’স থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতে ৪৫ মিনিট লেগেছে।

রাজধানীর উত্তরা থেকে আসা আল-হুমারা জানালেন, ১৫ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার সেন্টমার্টিনসে এসেছি। এখানকার সবকিছু প্রাকৃতিক। এখান থেকে সমুদ্র ও আকাশের নীল যেভাবে দেখা যায়, তা অন্য কোনো এলাকা থেকে দেখা যায় না। আগে যেমন দেখেছি, এখনও সেরকমই আছে। তবে একটু যেন ময়লা হয়েছে।

 

এ যেন মাছের রাজ্য

সেন্টমার্টিনসের আট হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই মৎস্যজীবী। খাবার হিসেবে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ তাজা সামুদ্রিক মাছ। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী কয়েক মিনিটের মধ্যে তা পরিবেশন করা হয়। এছাড়া শুঁটকি মাছের বেশ কয়েকটি দোকান আছে দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে। যেখানে পাওয়া যায় নাম-না-জানা বহু প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর শুঁটকি।

উত্তাল সাগরে জেলেদের মাছ ধরার দু:সাহসিক অভিযান হতে পারে পর্যটকদের জন্য আরও একটি আকর্ষণ। এখানকার দোকানপাট কিংবা স্থানীয়দের যে কোনো আড্ডায় প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকে মাছ নিয়ে। কে কত মাছ পেয়েছে, মাছের দরদাম কেমন, দেশের কোন এলাকার মানুষ কোন মাছ পছন্দ করে, সে সবই হচ্ছে স্থানীয়দের আলোচনার মূল বিষয়।

দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা মৎস্যজীবী বশির আলী বলেন, ৪৫ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরছেন। তার এই দীর্ঘ জীবনে এমনও মাছ ধরেছেন, যেটি একটাই বিক্রি হয়েছে লাখ টাকার উপরে। সমুদ্রে হারিয়ে গেছেন কয়েকবার। আবার এত বেশি মাছ পেয়েছেন যে, ট্রলারে জায়গা হচ্ছিল না, তখন ভয়ও পেয়েছেন। এক-দুই টন ওজনের হাঙ্গরও ধরেছেন। দাঁতালো হাঙ্গর ভয়ঙ্কর হলেও জালে আটকা পড়লে তারা আর কিছুই করতে পারে না।

তিনি জানান, ফুসফুসের জন্য বড় মাছগুলোর দাম বেশি হয়। তাই টেকনাফ ও কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা মাছ রেখে অনেক দাম দিয়ে ফুসফুস কিনে নিয়ে যান।

সেন্টমার্টিন’স প্রবাল দ্বীপ হিসেবে খ্যাত হলেও পর্যটকদের অতিরিক্ত আহরণের কারণে এখানকার প্রবাল অনেক কমে গেছে বলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। সেজন্য কয়েক বছর ধরে দ্বীপটির আশপাশ থেকে প্রবাল পাথর আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিনসে প্রবাল কমে যাওয়া নিয়ে নানা ধরনের কথা প্রচলিত আছে। এটা ঠিক যে, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিনিয়ত সেখান থেকে প্রবাল পাথর চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। সেন্টমার্টিনসের প্রবাল নিয়ে এখনও ব্যাপক গবেষণা বাংলাদেশে হয়নি, গবেষণা করলে জানা যেতো প্রবাল জš§ নিচ্ছে কি না। গবেষণা করে অতিমূল্যবান প্রবাল সম্পর্কে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

 

সালেহ নোমান

অতিথি লেখক

 

 

 

 

 

 

 

সর্বশেষ..