প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

নুহাশপল্লীর বুকে কয়েকজন হিমু

আবদুল হাকিম আবির: ‘লীলাবতী দীঘি’র অপরূপ সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মৃত মেয়ে লীলাবতীর কথা মনে পড়ছিল। দীঘির পাড়ে পাথরের ফলকে খোদাই করা- ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছে নয়ন নয়নে।’

দীঘির ওপর ছোট্ট কাঠের ব্রিজ, চারপাশে ঝাউ আর শ্বেত-চন্দনসহ শতাধিক ভিন্ন প্রজাতির গাছ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

গত ১৯ জুলাই বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হুমায়ূন আহমেদের পঞ্চম প্রয়াণ দিবসে তার সৃষ্ট কালজয়ী চরিত্র ‘হিমু’কে ধারণ করে আমরা কয়েকজন হিমু গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য নুহাশপল্লীর নির্জন বুকে শুয়ে থাকা হুমায়ূনকে শ্রদ্ধা জানানো। আমাদের টিমে প্রায় ৫০ জন হিমু ছিলেন। প্রবেশের পর প্রথমেই ফুল দিয়ে সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাই আমরা। তারপর সবাই মিলে নান্দনিক সৌন্দর্যের অনন্য সৃষ্টি নুহাশপল্লীর আনাচে-কানাচে খুঁজে ফিরেছি হুমায়ূনের ছোঁয়া। হুমায়ূনের অশরীরী ছোঁয়ার আনন্দে কখনও কখনও শিহরিত হয়েছি, আবার পরক্ষণেই তার বিচ্ছেদের কথা স্মরণ হলেই ভিজে এসেছে চোখের পাতা।

হুমায়ূন তার মনের মাধুরী মিশিয়ে নুহাশপল্লীকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। একজন মানুষের চিন্তা ও কল্পনাশক্তি কত শক্তিশালী হলে এত চমৎকার করে নিজের থাকার জায়গা সাজিয়ে তুলতে পারেন, নিজের চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।

ঘুরে ঘুরে আমরা দেখছিলাম, হুমায়ূন আহমেদের একেকটি শিল্পকর্ম আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলাম তাকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলার বেদনায়। অথচ নুহাশপল্লীর প্রতিটি গাছ আর পাখির কিচির-মিচিরের ভেতর আমি স্পস্ট হুমায়ূনের নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছিলাম। অসংখ্য ফলজ ও বনজ গাছের পাশাপাশি তিনি বানিয়েছেন ঔষধি গাছের বাগান। সব মিলিয়ে আড়াইশ প্রজাতির সবুজ গাছের এক বিশাল নন্দনকানন। খুব মনোযোগ দিয়ে গাছগুলোর কথা শোনার চেষ্টা করেছি। যেন সমস্বরে তারা গাইছে ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়…’।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দূরে একটা ছোট্ট পুকুর। পুকুরের বুকে মৎস্যকন্যার লাবণ্যময়ী চেহারায় আটকে যাওয়া চোখকে টেনে তুললো পুকুরের পাশে থাকা ভয়ঙ্কর ড্রাগনের প্রাণহীন অবয়ব। ভয় জড়ানো মুগ্ধতায় তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। কিছুটা সামনেই জিরাফ, সজারুসহ রয়েছে আরও কিছু প্রাণীর আদলে তৈরি অবয়ব। সবকিছুতেই রয়েছে লেখকের হাতের ছোঁয়া আর মায়াময় সৌন্দর্য।

হুমায়ূন আহমেদ যেখানে শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায় তার অনতিদূরেই সবুজ গালিচার মতো বিছিয়ে রাখা বিশাল মাঠ। শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় এ মাঠে হাঁটতেন আর জ্যোৎস্নার আলোয় সৃষ্ট নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলে বেড়াতেন এ সৌন্দর্যপূজারী মানুষটি। মাঠের মধ্যখানেই ঐতিহাসিক লিচুতলা। যে লিচুগাছ বাংলা চলচ্চিত্র আর নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল দীর্ঘদিন। গাছটিতে কোনো লিচু নেই কিন্তু চমৎকার দুটি ছোটঘর ঝুলে আছে। মনে হয় যেন লিচু গাছে ঘর ধরেছে! গাছটির অদূরেই রয়েছে একটি ছাউনির নিচে বিশাল আকারের দাবার কোর্ট, যার প্রতিটি ঘুঁটির উচ্চতা প্রায় দুই ফুট।

সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখনই বৃষ্টিবিলাস নামের সুন্দর একটি কটেজের সামনে গোল করে স্তরে স্তরে বসার জায়গা দেখতে পাই। এখানে বসে বৃষ্টিবিলাসের কারুকাজ দেখি কিছুক্ষণ। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার রিমঝিম ঝংকার সহযোগে বৃষ্টি উপভোগ করতে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন হুমায়ূন।

একটি চৌচালা ছোট টিনের ঘরের এতটা

সৌন্দর্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারলাম না। কিন্তু বৃষ্টিবিলাসের ভেতরে প্রবেশ করে আশাহত হলাম। বৃষ্টিবিলাস শূন্য। হুমায়ূন আহমেদ নেই!