নেতৃত্ব দুর্বলতায় লোকসানে ডুবছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল

দৈনন্দিন খরচ মেটানোর টাকাও নেই

শেখ আবু তালেব: নেতৃত্বের দুর্বলতায় একসময়কার ভালো মানের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও (এনবিএফই) এখন লোকসান দেয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে এ তালিকায় নাম লিখিয়েছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড। দুই বছর ধরেই একটানা লোকসান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণ, আমানত ও পরিচালন আয়। এমনকি দৈনন্দিন অর্থের জোগান দিতে হচ্ছে ঋণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই লোকসান দিচ্ছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।

প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় সব সূচকেই শক্ত অবস্থানে ছিল ইউনিয়ন ক্যাপিটাল। প্রতিবছর ভালো মুনাফা করেছে। একইসঙ্গে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ডও দিয়েছে। এরপর ২০১৯ সালে চৌধুরী মনজুর লিয়াকত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও’র দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ডুবতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সব আর্থিক সূচকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা নীতি ছাড়ের সুযোগে করোনা মহামারির মধ্যে যখন সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে উঠে এসেছে, তখনও মনজুর লিয়াকতের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি, বরং আরও অবনতি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২১ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। পরের বছর মুনাফা করে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালেও ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা মুনাফা করে। কিন্তু পরের বছরে এসেই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো লোকসানে চলে আসে এবং রীতিমতো ধস নামে। ওই বছর ইউনিয়ন ক্যাপিটাল প্রায় ১০৬ কোটি টাকা লোকসান করে। এর পরের বছরও থেকে যায় লোকসানের বৃত্তে। ২০২০ সালে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের লোকসান হয় ৫৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২১ সালের প্রথমার্ধেও (জানুয়ারি-জুন) ১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের শুরুতে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চলতি দায়িত্ব পান চৌধুরী মনজুর লিয়াকত। এরপর ওই বছরের অক্টোবরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। আর ২০১৯ সাল থেকেই অধঃপতনে যেতে থাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। ইউনিয়ন ক্যাপিটালের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মূলত প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মনজুর লিয়াকতের অদক্ষতার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি তলানিতে নেমেছে। এতে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের আমানতকারীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।

চৌধুরী মনজুর লিয়াকতের দায়িত্বপালনকালে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের লোকসান হয়েছে ১৭৪ কোটি টাকার বেশি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির গত বছরে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে যেখানে ঋণ, বিনিয়োগ ও লিজ থেকে আয় হয়েছিল ১৬১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ২০২০ সালে কমে হয়েছে মাত্র ১১৭ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা আমানত থেকেও সুদ আয় কমেছে। ২০১৯ সালে এ খাত থেকে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের আয় ছিল ১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২০ সালে এ খাত থেকে আয় কমে হয়েছে।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে কমেছে ঋণ, লিজ ও এসএমই খাতে বিনিয়োগ। ২০১৯ সালে ঋণ ও লিজের স্থিতি ছিল এক হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এক বছর পরে ২০২০ সালে তা নেমে দাঁড়ায় এক হাজার কোটি টাকায়।

তথ্য বলছে, ইউনিয়ন ক্যাপিটালের লোকসান আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খেলাপি হওয়া ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ৮৭ কোটি টাকা। এ পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করায় প্রভিশন কম রাখতে হয়েছে। প্রভিশনের এই অর্থ যোগ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায়।

তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপির পরিমাণ ছিল ২১৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২০ সালে তা কমে হয়েছে ১২৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০৫ কোটি টাকাই আদায়-অযোগ্য মন্দ মানের ঋণ।

পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় কমেছে ৭২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় ছিল ২২৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫৬ কোটি ২৩ লাখ টাকায়। এর মধ্যে দুই বছর ধরেই লোকসান গুনে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

নেতিবাচক দক্ষতায় আমানতকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। গত চার বছর ধরেই কমছে প্রতিষ্ঠানটির আমানতের পরিমাণ। ২০১৭ সালে যেখানে আমানতের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৬৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০২০ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।

একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে বিনিয়োগ ও সুদ আয়। ফলে সার্বিকভাবে কমে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা পর্যন্ত। ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয়ে তুলনামূলকভাবে স্থিতি ছিল, যা ২০১৯ ও ২০২০ সালে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশেষ করে কমেছে সুদ থেকে আয়।

শুধু লোকসানের হিসাবে নয়, তার সময়ে অন্য সব সূচকেও তলানিতে নেমেছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০১ কোটি ৪২ লাখ টাকার মূলধন সংকটে রয়েছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় যা ছিল, বর্তমানে তা প্রায় দেড় টাকা। ২০১৯ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ছয় টাকা ১৩ পয়সা, ২০২০ সালে লোকসান হয়েছে তিন টাকা আট পয়সা। আর ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ৮৪ পয়সা।

প্রতিষ্ঠানটির সম্পদমূল্যও কমেছে চৌধুরী মনজুর লিয়াকতের সময়ে। ২০১৮ সালে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ছিল ১৪ টাকা ছয় পয়সা। সেখানে ২০২০ সালে এনএভি কমে হয়েছে চার টাকা ১২ পয়সা।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্তির পর থেকে প্রতিবছর শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিয়ে এলেও চৌধুরী মনজুরের সময় কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের পাঁচ শতাংশ থেকে শুরু করে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত স্টক ও ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দিতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ইউনিয়ন ক্যাপিটালের বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মঞ্জুর লিয়াকত শেয়ার বিজকে বলেন, ‘৫০০ কোটি টাকার আমানত থেকে আমাদের কোনো সুদ আয় আসছে না। এজন্য লোকসান হয়েছে গত দুই বছরে। কিন্তু গত বছরে আমাদের লোকসান কমেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন ভালো চলছে। সামনের দিকে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল আরও ভালো করবে।’

ক্যাশ-ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আটকে আছে। আবার ব্যাংকের কাছ থেকে সেভাবে আমানত সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তাই নগদ টাকার একটু টান রয়েছে। এজন্য আমরা আমানত সংগ্রহে বেশি জোর দিচ্ছি।

সর্বশেষ..