সুশিক্ষা

নোবিপ্রবিতে ভর্তি পরীক্ষা নোয়াখালীর দৃষ্টান্তমূলক আতিথেয়তা

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে পরবর্তী পড়াশোনা করতে একটি আসনের জন্য মরিয়া হয়ে শিক্ষার্থীদের সারা দেশ ঘুরতে হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় একটি আসন নিশ্চিত করতে। এই সময়টায় বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিচিত মানুষজনের কাছে গিয়ে হয়রানির স্বীকার হতে হয় শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে। এ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন সর্বস্তরের ও সব পেশার মানুষ।

২০০৬ সালে চারটি বিভাগ নিয়ে ঢাকার

দক্ষিণ-পূর্বে ২১০ কিলোমিটার দূরে প্রতিষ্ঠিত হয় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি নোয়াখালীর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভালোবাসা দিয়ে আপন করেছে নোয়াখালীর মানুষজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের

ছাত্র-শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, এখানকার মানুষের ভালোবাসা পান এখানে পরীক্ষা দিতে আসা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরাও।

যে সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষা দিতে গিয়ে হয়রানি হতে হয় শিক্ষার্থীদের, সে সময় নোবিপ্রবিতে পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীরা পেয়ে যান নিরাপদ ঠিকানা। সুযোগ পেলেই অন্যদের আপন করে নিজেদের সুনাম কুড়াতে ব্যস্ত নোয়াখালীর মানুষ। প্রতি বছর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় এমন একটি সুযোগটাই পায় তারা। এখানে পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের আপন করে ভালোবাসা অর্জন করে নেয় নোয়াখালীবাসী।

এবার নোবিপ্রবির ভর্তি পরীক্ষায় আবেদন পড়ে ৬৮ হাজার ৭৬০টি। একই শিক্ষার্থীরা কয়েকটি ইউনিটে আবেদন করেন। সে হিসেবে এবার পরীক্ষা উপলক্ষে নোয়াখালীতে প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক আগমন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি তাদের সবাইকে সেবা দিয়েছে নোয়াখালীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ বছর নোয়াখালী জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, নোয়াখালী পৌরসভা, নোয়াখালী উপজেলা পরিষদ, রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয়রা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা করেছেন। নোয়াখালীবাসী সবার সমন্বয়ে ৭০ হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য ১০০টি বাস এবং ৫০ হাজার বোতল পানি দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী। এ ছাড়া পরিবহনের জন্য ১০০টি মোটরসাইকেল, ৪০০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও তিনটি মেডিক্যাল টিম ছিল নোয়াখালী পৌরসভা মেয়র শহীদুল্লাহ সোহেলের পক্ষ থেকে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পরীক্ষা শেষে বের হয়ে যে সময় শিক্ষার্থীরা ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় রেস্তোরাঁ খুঁজতে ব্যস্ত ঠিক সে সময় নোবিপ্রবি ভর্তিচ্ছুরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরীক্ষা শেষে ফাইল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি খাবারের প্যাকেট ও পানির বোতল হাতে কেন্দ্র থেকে বের হয়েছেন।

‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা শেষে খাবার নিয়ে বের হয়ে এক শিক্ষার্থী বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় যেখানে খাবার পাওয়াটাই অনেকটা কষ্টসাধ্য এবং খাবার পেলেও চড়া দামে সেগুলো কিনতে হয়, সেখানে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার পাওয়াটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। নোয়াখালীর আতিথেয়তা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

নোয়াখালীবাসীর আতিথেয়তায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের স্বজনরা সিক্ত হয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই তারা নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। নোয়াখালী থেকে নিজ গন্তব্যে ফিরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সহায়তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।

কেউ এতদিন নোয়াখালী নিয়ে ট্রল করার জন্য ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে আর না করার শপথ নিয়েছেন, কেউ ‘অতিথিপরায়ণতার নারায়ণ নোয়াখালী’ আখ্যা দিয়েছেন এবং সব

পরীক্ষার্থীই নোয়াখালীবাসী ও নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার প্রশংসাসূচক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

ছোট বোনের অভিভাবক হিসেবে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা লিজা বলেন, নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ভর্তি পরীক্ষায় নোয়াখালীবাসী এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেওয়া উদ্যোগ আজীবন উদাহরণ হয়ে থাকবে। বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে থাকার জায়গা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়। নোয়াখালীতে কোনো আত্মীয় থাকুক বা না থাকুক কারোরই কোনো চিন্তা করা লাগেনি। নতুন শহরে এসে যাতায়াত নিয়ে সবাই ভোগান্তিতে পড়েন। কিন্তু এখানে প্রত্যেক কেন্দ্রে পৌঁছতে পরীক্ষার্থীদের জন্য কর্তৃপক্ষের যাতায়াত সুবিধা ছিল। তাছাড়া প্রতিটা পয়েন্টেই সহায়তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক ছিল। নোয়াখালীর মতো অন্য সব জায়গায়ও যদি এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের কোনো চিন্তা থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. দিদার উল আলম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, নোয়াখালীর সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা আমাদের এবারের ভর্তি পরীক্ষা অনেক সহজ করে দিয়েছে। এবারের পরীক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকরা নোয়াখালীর মানুষের চিরচেনা আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে ফিরে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিডিয়ায় যা ব্যাপক প্রচার পেয়েছে।

এভাবেই হাজার বছর ধরে নোয়াখালীর মানুষ বাঁচিয়ে রাখবে তাদের হƒদয় জুড়ানো ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আতিথেয়তা। হাজার লক্ষ কোটি মানুষের হƒদয়ে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর আবেগে ঠাঁই করে নেবে অনন্তকাল ধরে। সেখান থেকে তৈরি হবে নতুন কিছু ফাল্গুনের গল্প।

  মো. ফারহান

সর্বশেষ..