সারা বাংলা

নোয়াখালীর সাপ্তাহিক হাট জমে না, টিকে আছে নামমাত্র

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: গ্রামীণ সভ্যতায় লেগেছে শহুরে হাওয়া। বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নের ফলে গ্রামের অনেক পথ শহুরে বলে বিভ্রম জাগে। এমনকি শহরের মতো হয়ে গেছে গ্রামের অনেক গলি সরু ও গাছপালাবিহীন। এসব সরু গলিতে দিনরাত বসছে হাটবাজার।

প্রায় সবখানে পণ্যসামগ্রী বিকিকিনি চলে। শুধু নামেই টিকে আছে নোয়াখালীর সাপ্তাহিক হাটগুলো। হারিয়ে গেছে এর ঐতিহ্য। একসময়কার বাজারজুড়ে হাঁটাচলা, ঠেলাঠেলি ও শোরগোলের দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। হাটগুলো এখন আর তেমন একটা জমে না।

নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদাপাতি আর পণ্য বেচাকেনার জন্য অনেকে হাটে যান না। এলাকার মোড়ে গড়ে ওঠা দৈনিক বাজারে তারা সেরে ফেলেন প্রয়োজনীয় কেনাকাটা। ফলে জৌলুস হারাচ্ছে এখানকার হাটগুলো।

জানা যায়, ৯ উপজেলা ও আট পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালীতে একসময় শতাধিক সাপ্তাহিক হাট বসত। এসব হাটের মধ্যে পৌর এলাকার দত্তের হাট ছিল অন্যতম। অবশ্য জেলার  ব্যবসাকেন্দ্র চৌমুহনীরও সেই পুরোনো দাপট এখন অতীত। এখন আর সকাল-সন্ধ্যা পাইকারি খরিদদাররাও আগের মতো আসে না। মোবাইল ফোনে চলে ব্যবসায়িক লেনদেনসহ প্রয়োজনীয় কথোপকথন।

বিখ্যাত হাটের মধ্যে ছিল হাতিয়া উপজেলার আফাজিয়া বাজার, দাসের হাট, তমরুদ্দিন বাজার, সাগরিকা বাজার, ভুইয়ার হাট, সাহেবানী বাজার, ওছখালি বাজার, সুবর্ণচর উপজেলার হারিছ চৌধুরী বাজার, খাসের হাট, ভুইয়ার হাট, আক্তার মিয়ার হাট, জনতা বাজার, বাংলাবাজার, আবদুল্লাহ মিয়ার হাট, থানার হাট, সদরের নুরু পাটওয়ারি হাট, দুম্বা পাটওয়ারী বাজার, বাংলাবাজার, ওদার হাট, শান্তির হাট, ভাটিরটেক চৌমুহনী বাজার, ওয়াপদা বাজার, খলিফার হাট, দানা মিয়ার বাজার ও দিনমনির হাট। বেগমগঞ্জ উপজেলায় নামকরা হাটের কয়েকটি ছিল বাংলাবাজার, ছমির মুন্সি, একলাশপুর বাজার, সেনবাগের ছাতারপাইয়া ও কানকির হাট। সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়া, বাংলাবাজার, বজরাবাজার, চাটখিলের সোমপাড়া, ও খিলপাড়া বাজার ছিল নামকরা। আর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাংলাবাজার, চাপরাশির হাট, কবিরহাটের কবিরহাট, ভুইয়ার হাট, কালামুন্সি ও শাহজীর হাট উল্লেখযোগ্য। সপ্তাহে দু’দিন করে এসব হাট বসত বাজারের মূল রাস্তা ঘিরে, কিংবা ছায়াঘেরা কোনো স্থানে। কালের প্রবাহে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে হাটগুলো, তেমনি অমৃত সেই জিলাপি ও গুলগুলাও। এসবের স্বাদ এখন আর অবশিষ্ট নেই।

জানা গেছে, হাটের দিন সকালে পলিথিন অথবা কাপড়ের ছাউনি দিয়ে ব্যবসায়ীরা সাজানো হতো দোকানপাট। এরপর গ্রামের কৃষকরা হাটে নিয়ে যেতেন তাদের ক্ষেতে উৎপাদিত টাটকা শাকসবজি ও মৌসুমি শস্য। দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কেনাবেচা চলত। হাটের দোকানগুলোয় পাওয়া যেত চাল, ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারাতে বসেছে গ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এসব হাটবাজার। এর ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এসব হাট।

বর্তমান বাজারে গিয়ে এখন পাওয়া যায় না অমৃত সেই বাতাসা। পাওয়া যায় না টাটকা শাকসবজি। নদীনালা ও খালবিল থেকে ধরে আনা ছোট-বড় নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ তো চোখেই পড়ে না।

জেলা সদরের ধর্মপুরের ভাটিরটেক বাজারের সভাপতি নজির আহমেদ বলেন, কয়েক বছর আগে এখানকার হাটগুলো ছিল বেশ জমজমাট। এখন আগের মতো সে অবস্থা নেই। এখন হাটে তেমন লোকজন আসে না। বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট হয়ে যাওয়ায় হাটে মানুষের আসা-যাওয়া কমে গেছে। দিন পাল্টেছে, সবকিছুতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। ফলে প্রায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী এসব হাট।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..