সারা বাংলা

নোয়াখালীতে জেগে ওঠা চর প্রভাবশালীদের দখলে

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: নোয়াখালীতে মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা হাজার হাজার একর জমি অনেক আগেই দখল হয়ে গেছে। দখলের পেছনে জেলার সব দলের নেতার যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সুবর্ণচরের চরউরিয়া, চরলক্ষ্মী, চরনোমান, চরবায়েজিদের বিশাল এলাকাজুড়ে সরকারি জমি লক্ষ্মী এগ্রো ফিশারিজের দখলে রয়েছে। যার মালিক ডেসটিনি গ্রুপের পরিচালক আল ফরিদ।
স্থানীয়রা জানান, ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দখল করা এ জমিতে আল ফরিদের একাধিপত্য ছিল। প্রায় সময় তিনি ঢাকা থেকে সদলবলে এখানে আসতেন। রাতে আসর জমানো হতো। লক্ষ্মী এগ্রো ফিশারিজের নামে এসব খাসজমি দখলের সময় অনেকগুলো ভূমিহীন পরিবারকে রাতারাতি উচ্ছেদ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি এসব জমি দখল করে তিনি কোটিপতি বনে গেছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গত শুক্রবার আল ফরিদের নম্বরে ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। বক্তব্য জানতে গ্রামের বাড়ি সুবর্ণচরের চরক্লার্কে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফরিদের এক আত্মীয় জানান, শুনেছি ওই জায়গার কিছু অংশ ফেনীর শাহজাহান ঠিকাদারের কাছে কয়েক কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। কিছু অংশ অন্য প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আল ফরিদ ছাড়াও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের আক্তার মিয়ার হাটের পাশে জনতা ব্যাংক কর্মচারী সামছুল হাসান প্রায় ১০০ একর দখল করেছেন। বিএনপির শাসনামলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ‘কাছের মানুষ’ পরিচয়ে তিনি এসব জমি দখল করেন। তবে এসব জমি নিজের কেনা বলে দাবি করেন সামছুল হাসান।
এছাড়া খাসজমি দখলে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্যাহ বুলু এবং সরকারদলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ। তবে সুবর্ণচরের যে ১০০ একর জমিতে সলজিত ডেইরি অ্যান্ড মৎস্য খামার তা নিজের কেনা বলে দাবি করেন বরকত উল্যাহ বুলু।
গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরণের চরমজিদ এলাকায় সরকারি জমিতে রয়েছে আটটি প্রকল্প। তার দখলে ২০০ একর জমি রয়েছে জানিয়ে বলেন, পুরো জমিতে গাছ লাগানো হয়েছে। মাছ, ধান, সয়াবিন চাষ হয়। প্রতি মাসে মৎস্য প্রকল্পের জন্য একরপ্রতি দেড় হাজার টাকা ও কৃষিজমির জন্য ৬০০ টাকা সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তিনি এ জমির বন্দোবস্ত পেয়ে যাবেন বলে জানান। নোয়াখালীর আল আমিন গ্রুপের আনোয়ার মির্জার দখলে রয়েছে প্রায় ৫০০ একর জমি। তার ভাই শামীম মির্জার আল-বারাকা এগ্রো ফিশারিজের দখলে রয়েছে শতাধিক একর জমি।
চরনোমান ও চরবায়েজিদ এলাকায় ২০৭ একর খাসজমি কিনে ঢাকা-নিউইয়র্ক এগ্রো ফিশারিজ নাম দিয়ে মাছ চাষ করছেন সোনাইমুড়ী উপজেলার চেয়ারম্যান খন্দকার রুহুল আমিন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। চরনোমানে ৫০ একর জমি দখল করে গড়ে তুলেছেন রাসেল এগ্রো ফিশারিজ। এসব জমির মালিক তার ছেলে বলে দাবি করেন তিনি।
আমিন আহমেদ ভূঁইয়া বা ডলার আমিনের চরআলাউদ্দিন এলাকায় দখলে রয়েছে ৩০০ একর জমি। স্থানীয় মহিউদ্দিন চৌধুরীর চরআক্রাম উদ্দিনে ৪০০ একর জমি দখলে রয়েছে। এছাড়া চরনোমানে মোশারেফ গ্রামার মৎস্য খামারের নামে ১৪০ একর, নুরু মিয়া মৎস্য খামারের নামে ১৩০ একর, চরআলাউদ্দিনে আজাদ এগ্রো ফিশারিজের নামে ১১২ একর এবং চরআক্রাম উদ্দিনে বাইতুশ সাইফ মৎস্য খামারের নামে ১৫২ দশমিক ৫৫ একর, মৈত্রী এগ্রো ফিশারিজের নামে ২৬৮ দশমিক ৮৭ একর, লাদেন নামে এক ব্যক্তির দখলে ৪০০ একর জমি রয়েছে। সরেজমিনেও জমি দখলের সত্যতা মিলেছে।
সূত্র জানায়, গত তিন দশক ধরে মেঘনায় জেগে ওঠা জমি দখল হয়ে গেলেও ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে দখলদাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৫৮ ফিশারিজ ও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার তা দখলে চলে যায়। ২০০৯ সালে জেলা প্রশাসন ৪৩ অবৈধ দখলকারীকে চিহ্নিত করলেও ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সরকারি হিসাবে মৎস্য খামারের নামে শুধু সুবর্ণচরেই বেদখল হওয়া জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৫৪ দশমিক ৬৭ একর। বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালীতে গত ৭০ বছরে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হলেও জেগে উঠেছে এক হাজার বর্গকিলোমিটার। নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইডিপি) গবেষণা ও জরিপ অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৫৭৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি জেগে উঠেছে। বিলীন হয়েছে ১৬২ বর্গকিলোমিটার। এ হিসেবে বছরে গড় বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার।
এ বিষয়ে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম ইবনুল হাসান ইভেন জানান, নতুন চরগুলোতে সিডিএসপির চতুর্থ ধাপের মাধ্যমে এখনও ভূমিহীনদের জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। চরাঞ্চলে জেগে ওঠা জমি ভূমিহীন ছাড়া অন্য কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস জানান, অর্থনৈতিক জোন হিসেবে প্রস্তাবিত মোট জমির মধ্যে ১১ হাজার ৫৪ দশমিক ৬৭ একর চিংড়িমহালের নামে দখল হয়ে গেছে। এ নিয়ে বেশকটি মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আইনগত জটিলতায় এ জমি দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

সর্বশেষ..