আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা সারা বাংলা

নোয়াখালীতে পালিত হচ্ছে নিরানন্দ ঈদ!

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: মহামারি করোনার কারণে চরম নিরানন্দে পালিত হচ্ছে এবারের ঈদ। অনেকেরই ভাবনা ছিল রোজার মধ্যে হয়তো করোনা আরও শিথিল হয়ে আসবে।

কিন্তু দেখতে দেখতে রোজার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। ঈদ অতি নিকটে বাঁশি হাঁকছে, অথচ করোনা শেষ হয়নি। এ কারণে দুর্ভোগ আর দুশ্চিন্তাও কাটেনি জেলাবাসীর দৈনন্দিন জীবনে।

করোনার কারণেই এবারের ঈদ অনেকটা অগোছালো, প্রাণহীন ও অসাজানো গোছে কাটাতে হচ্ছে পুরো বিশ্বের মতো নোয়াখালীতেও। দীর্ঘ প্রায় দু’মাসের অধিক সময় মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকেরই আয়-রোজগার বন্ধ।

মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারে কষ্টের হাহাকার চললেও অনেকটা যেন সহনীয় হয়ে চলছে। এ অবস্থায় ঈদের বাড়তি খরচ জোগানও অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না। বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও বেতন-বোনাস প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে অভাবনীয় ধাঁচে চলছে এবারের অন্যরকম ঈদ।

প্রতি বছর রোজার শুরু থেকে ঈদকে সামনে রেখে জেলা শহরের বড় বড় শপিং মল ও রকমারি দোকান ছাড়াও পাড়া-মহল্লা ও গ্রামের হাটবাজারগুলোয় ঈদের কেনাকাটার একটা ধুম লেগে থাকত। নিজের পছন্দের পোশাক কিনত যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ। কিন্তু এবারের ঈদ কারও জন্য জুতসই হয়ে উঠছে না।

জেলা শহরের কিছু মানুষ ফুটপাতে আসা-যাওয়ার পথে ঠেলা-ট্রলি থেকে বাচ্চার জন্য নামমাত্র কেনাকাটা করলেও বস্তুত তা ছিল ছোটমণিদের কোনো রকম মানিয়ে দেওয়া। জেলা সদরের ধর্মপুরের মর্জিনা বেগম বলেন, কাজ নেই। তিনবেলা খেতেই কষ্ট। ঈদ দিয়ে কী করব!

তাছাড়া জেলা শহরের আড়ালে-আবডালে শাটার টেনে কিছু দোকানপাটে খুচরা বেচাকেনা চললেও সে পণ্যগুলোও ছিল অনেক পুরোনো। তাছাড়া এসব দোকানে অত্যধিক দাম নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অন্য সময়ে বাচ্চাদের ৩০০ টাকার পোশাকের দাম নেওয়া হচ্ছে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত।

সফিপুরের মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হকার্স মার্কেট এ রমজানে এক সপ্তাহ খোলা ছিল। এ সময় বাচ্চার জন্য কিছু কেনাকাটা করেছি, তবে নিজের জন্য কিছুই নিইনি।
নেয়াজপুরের আবুল হোসেন বলেন, জেলা শহরের জজকোর্ট সড়কে ট্রলি থেকে ৬৫০ টাকায় দু’বাচ্চার জন্য কেনাকাটা শেষ করেছি।

তবে বাচ্চার মায়ের পছন্দ হয়নি। জেলা জজকোর্টের আইনজীবী সহকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, করোনার মধ্যে দোকানপাটে কিনতে গেলে সচেতন কেউ দেখলেও পাগল মনে করবে। তাই কেনাকাটার আইটেম একেবারে বাদ দিয়েছি।

মতিপুরের মিজানুর রহমান বলেন, বেঁচে থাকলে জীবনে কেনাকাটা করা যাবে। আপনি যে পোশাকটি দেখছেন, সেটি হয়তো আরও বেশকিছু লোকেরও হাত পড়েছে। তাতে যে করোনা ছিল না তা তো বলা যায় না, তাই পোশাক থেকেই সাবধান।

নতুন পোশাকের আড়ালে নতুন রোগ করোনা যেন আপনার ঘরে না আসে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার কথা বলেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ কবির আহমেদ চৌধুরী। তার মতে, আরও কিছু সময় এভাবে চলতে হবে।

আলিকো ইন্স্যুরেন্সের মাইজদী কোর্টের এজেন্সি ম্যানেজার ইমাম হোসেন বলেন, মনটা ভালো নেই। আজ প্রায় দু’মাসের অধিক সময় ঘরে শুয়ে-বসে সময় কাটাচ্ছি। এভাবে আর কত! তিনি বলেন, প্রতি বছর নিজের বউ-বাচ্চাসহ পরিবারের আরও অনেকের জন্য কমপক্ষে ৫০-৬০ হাজার টাকার কেনাকাটা করি। এবার এক টাকারও নয়। নিজে বুঝলেও বাচ্চাদের জন্য খারাপ লাগছে।

নোয়ান্নয়ের আলী আহমদ বলেন, প্রতি ঈদে মসজিদে পাড়া-প্রতিবেশীসহ এক ভাইয়ের সঙ্গে আরেক ভাই কোলাকুলি করি। এবার তা নেই। এর চেয়ে বেদনা আর হৃদয়বিদারক ঘটনা আর কী হতে পারে?

ভালো নেই ক্ষুদ্র, মাঝারি ও উচ্চ পর্যায়ের কোনো ব্যবসায়ীও। মাইজদীর জুতা ব্যবসায়ী রাসেল মিয়া বলেন, প্রতি বছর ঈদের জন্য অপেক্ষা করি। ঈদ এলে অন্তত সারা বছরের বেচাকেনা এক মাসেই করতে পারি।

তাতে মালিক-শ্রমিক সবাই একটা সুবিধা পায়। এবার আর তা হলো না। দোকান বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় নেই। ধর্মপুরের মুদি ব্যবসায়ী জাফর উল্লাহ বলেন, প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে ভালো বিক্রি হয়। এবার কেউ তো সেমাই, চিনি, মশলা এখনো তেমন নিচ্ছে না।

সুবর্ণচরের থানার হাটের আজিজ মিয়া বলেন, প্রতি ঈদে ছেলেমেয়েরা ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে আসে। বাড়ি হয়ে ওঠে আনন্দময়। এবার কেউই আসছে না। মনটা বিষন্ন। একই কথা জানালেন সোনাপুরের ফরিদা আক্তারও। বললেন, মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনিরা কেউ আসতে পারছে না। তাই এবার ঈদে মনটা ভীষণ খারাপ থাকছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..