প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পঁচিশ বছরে বনাঞ্চল কমেছে ২৫ শতাংশ

নাজমুল হুসাইন: প্রতিবছরই কমছে দেশের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। ১৯৯০ সালে দেশের ম্যানগ্রোভ, শাল, বাঁশ ও পাহাড়ি বন মিলে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ছিল ছয় লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ হেক্টর। ২০১৫ সালে এ চার ধরনের বনের মোট পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ দুই হাজার ২৪০ হেক্টরে। অর্থাৎ ২৫ বছরের ব্যবধানে এ চার ধরনের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কমেছে এক লাখ ৪১ হাজার ৩৬০ হেক্টর বা প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হারে কমেছে পাহাড়ি ও বাঁশের বনাঞ্চল।

সম্প্রতি বন অধিদফতরের ২০১৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত দেশে বনায়নের ওপর উপস্থাপিত কৌশলপত্রে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তথ্যানুসারে, দেশে ১৯৯০ সালে দেশে পাহাড়ি বনের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৮ হাজার ৬৩০ হেক্টর। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯ হাজার ১৬০ হেক্টরে। আর একই সময়ে ব্যবধানে দেশে বাঁশবনের পরিমাণ ৮৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪০ হেক্টরে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন অধিদফতরের প্রধান বনসংরক্ষক ইউনুছ আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বনাঞ্চলের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তা একেবারে সুনির্দিষ্ট নয়। পাহাড়ি ও বাঁশবনের পরিমাণ কমেছে, তবে এতটা নয়। এছাড়া এখনও বান্দরবান ও আশপাশের এলাকায় অনেক পাহাড়ি বন রয়েছে, যা পরিসংখ্যানের আওতায় আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ি বনাঞ্চল বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু হচ্ছে শিগগির। দেশে নতুন বনভূমি যুক্ত হচ্ছে। সামাজিক বনাঞ্চলের বিপ্লবও হয়েছে।’

এদিকে দেশের বনাঞ্চলে কমার একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায় গত বছরের জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে। গত জুলাইয়ে বিশ্বের বনাঞ্চল নিয়ে প্রকাশিত ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ফরেস্ট-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার হেক্টর বনভূমি কমেছে। এর মধ্যে শেষ পাঁচ বছরেই কমেছে ১৩ হাজার হেক্টর। ওই প্রতিবেদনে বিশ্বে বনভূমি কমার শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ।

অন্যদিকে বন অধিদফতরের কৌশলপত্র অনুযায়ী, দেশে ১৯৯০ সালে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের পরিমাণ চার লাখ এক হাজার ৫৩০ হেক্টর ছিল, যা ২০১৫ সালে তিন লাখ ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টরে এসেছে। আর একই সময়ের ব্যবধানে শালবন ২৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর থেকে ১৭ হাজার ৪৯০ হেক্টর হয়েছে। সার্বিকভাবে দেশের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ বনভূমি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক শালবন ও ১১ শতাংশ প্রাকৃতিক পাহাড়ি বন বাকি রয়েছে, যা হুমকির মধ্যে।

বনাঞ্চল বাড়াতে দেশে প্রচুর বনায়ন প্রয়োজন। এ বনায়ন বাড়াতে নানা প্রতিবন্ধকতার বিষয় উঠে এসেছে কৌশলপত্রে। এর মধ্যে আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে ২০১৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ছয় লাখ ২০ হাজার হেক্টর বনায়ন প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে সরকার থেকে পাওয়া যাবে মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে এ খাতের উন্নয়নে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়াবে সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া জনবল সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ।

এসব বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) দেশীয় প্রতিনিধি ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বৃক্ষাচ্ছাদিত বনে প্রাণ ও প্রাণীর প্রাচুর্য থাকে। বিচ্ছিন্ন বনায়নে সৃষ্ট বনে তা থাকে না। তাই প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও এর বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া জরুরি। এর বিকল্প নেই।’

তবে দেশের বন বিভাগের হিসাব দেয় উল্টো পরিসংখ্যান। তাদের হিসাবে গত ২০ বছরে বাংলাদেশের বনভূমি কমেনি বরং বেড়েছে। বন বিভাগের ২০০৭ সালে করা সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বনভূমির পরিমাণ ছিল ১৩ শতাংশের বেশি।  এখন বনভূমির পরিমাণ বেড়ে মোট ভূমির ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় বননীতি ২০১৬-এর খসড়া অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ২০ শতাংশ ভূমিকে বনভূমিতে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।