দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন

সানেমের সভায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনাকালে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ চাঞ্চল্য আনতে হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। করোনার সময় চাহিদা ও উৎপাদন উভয় দিক দিয়ে ধস নেমেছে। এ জন্য পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন আনতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন।

গতকাল সানেম ও এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে আলোচনা সভায় এমন কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। করোনাকাল ও ব্যবসায়ীদের মনোবল জানতে মাঠপর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জরিপকৃত ফল নিয়ে ওই সভার আয়োজন করা হয়। অনলাইনে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান।

জরিপে গত এপ্রিল-জুন সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরা হয়। জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের মতামত নিয়ে একটি ইতিবাচক ধারণা ফুটিয়ে তোলা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গত এপ্রিল-জুন সময়ে অর্থনীতির সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলো হচ্ছে- প্রকৌশল, তৈরি পোশাক শিল্প, পাইকারি ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, হালকা ও চামড়া শিল্প। অপরদিকে করোনাকালেও ব্যবসা করতে পেরেছে ওষুধ ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো।

সারা দেশের উৎপাদন ও সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে অনলাইনে জরিপটি চালানো হয়। জরিপে ৩০৩টি কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। এসব খাতের ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয় জরিপের তালিকায়। জরিপে হালকা প্রকৌশল, তৈরি পোশাক শিল্প, বস্ত্র, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, টেলিকম, ভ্রমণ, আবাসন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, হোটেল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং টেলিকম খাতের কোম্পানিকে বেছে নেওয়া হয়।

আটটি বিভাগের ২২টি জেলায় অবস্থিত কোম্পানিকে নেওয়া হয় জরিপ কাজে। এরমধ্যে এক তৃতীয়াংশ কোম্পানির অবস্থান ঢাকায়। জরিপের ফলাফলে বেরিয়ে আসে, অংশগ্রহণকৃত কোম্পানির ৫৫ শতাংশই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পায়নি। অবশিষ্টদের মধ্যে ঋণ নিতে পেরেছে ৩৪ শতাংশ ও ১১ শতাংশ ঋণের বিষয়ে কিছুই জানে না। এসব কোম্পানির ৬৪ শতাংশই মনে করে ব্যাংক ঋণে জটিলতা বেশি হওয়ায় সময়ক্ষেপণ হয় বেশি। ৬১ শতাংশই মনে করে ব্যাংকের সেবা প্রাপ্তিতেও সমস্যা হয়। অপরদিকে  প্রণোদনা সুবিধা নিতে হলে ব্যাংকারদের ঘুষে দিতে হয় বলে জানান ১৮ শতাংশ। প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে ৪৭ শতাংশই মনে করেন অর্থনীতির জন্য খুবই সহায়ক।

জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৮৮ শতাংশই জানান ব্যবসা খরচ বৃদ্ধির জন্য দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ দায়ী। বাণিজ্য সম্পাদনে বন্দর সমস্যা ও শুল্কায়ন জটিলতা দায়ী বলে মনে করেন ৭১ শতাংশ উদ্যোক্তা। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ মনে করেন প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ বছরের শেষের দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা উন্নীতি হবে বলে আশা করছি। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ৯ শতাংশ বা বেশি হতে পারে। এটি নির্ভর করবে আমাদের দেশের অনেক কিছুর ওপর। অপরদিকে আমাদনিকারক দেশের করোনা পরিস্থিতি কেমন হবে তাও দেখতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ে আমাদের রপ্তানি কিছুটা ভালো হয়েছে। এটি হয়েছে করোনার কারণে রপ্তানি পণ্য কিছুটা জমেছিল, এটি এখন হয়েছে। এখন চেষ্টা করা হচ্ছে রপ্তানি বৃদ্ধিও করতে। চীনের বিদেশি বিনিয়োগ অন্য দেশে যাচ্ছে। আমাদের পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে, প্রবাসী দক্ষ অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। তাদেরও কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে যদি আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকর্ষণ করতে পারি তাহলেও অর্থনীতি উপকৃত হবে বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন, দুর্নীতির উৎসটা কি তা দেখতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে ৫০ বা শত লোক জড়িত। দুর্নীতির খরচ কিন্তু মুনাফার চেয়ে খুব বেশি নয়। কেন তারা দুর্নীতি করছে, সেটিও দেখতে হবে। একইসঙ্গে শাস্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বছরের শুরুতে উদ্যোক্তারা জানতে পারেন না তার কর দায়ভার কি হবে। এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া যেতে পারে। রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা পেতে কর সনদের বিষয়টি আরও পর্যালোচনার করা যেতে পারে। কর কর্মকর্তা কীভাবে রপ্তানির তথ্য যাচাই করে দেখবেন তা ভাবার সময় হয়েছে। তিনি আর বলেন, অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকের মালিকানায় থাকেন। সেক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের বেলায় কিছুটা দুর্বলতা থাকে, ঋণের মান কমে যায়। এটিও অর্থনীতিতে একটি ক্ষতের সৃষ্টি করা হয়।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের আলোচনায় অংশ নেন একে খান টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান, চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মানজুর ও পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ, এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবির।

এবারই প্রথম চাহিদা ও তৈরির উভয় খাতেই ধস নেমেছে। পূর্বে শুধু চাহিদা খাতে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে এটি হয়েছে। এ জন্য নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা সব সময় আধুনিকায়ন থাকে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন বিনিয়োগের স্বার্থে। আমাদের নীতিমালাগুলো দীর্ঘমেয়াদি নয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..