প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

পতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার

আস্থা ফেরাতে পারছে না প্রণোদনা

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: গত এক মাসে মাত্র আট কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী ছিল ডিএসইর প্রধান সূচক। কমেছে অধিকাংশ শেয়ার এবং ইউনিটের দর। একইভাবে কমেছে গেছে ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি। পোর্টফোলিও থেকে পুঁজি উধাও হয়ে গেছে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর। শুধু এক মাস নয়, এক বছরের বেশি সময় ধরে পতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। নানা প্রণোদনায়ও আস্থা ফেরেনি বিনিয়োগকারীদের।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৮ সালের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকের অবস্থান ছিল ছয় হাজার ২৫৪ পয়েন্টে। আর পতনের জের ধরে সর্বশেষ গতকাল সূচক নেমে এসেছে চার হাজার ৬২ পয়েন্টে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে সূচক হ্রাস পেয়েছে এক হাজার ৩৯২ পয়েন্ট। এ সময়ে লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে বাজার মূলধন, যার পরিমাণ ৫৬ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের প্রথম দিনে ডিএসইর তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজার মূলধন ছিল চার লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৬ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। গত ২১ মাসের মধ্যে ডিএসইতে সর্বোচ্চ বাজার মূলধন ছিল চার লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ৩ জানুয়ারি এটা ছিল রেকর্ড মূলধন। এর পর থেকে বাজার মূলধন ক্রমাগতভাবে কমছে।
অন্যদিকে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে নতুন ২১টি প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি রাইট এবং বোনাস শেয়ার মিলে শেয়ার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। নিয়ম অনুয়ায়ী এ অবস্থায় বাজার স্থিতিশীল থাকলে সূচক আরও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বাজার মূলধনও। কিন্তু পুঁজিবাজার অনুকূলে না থাকায় এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয় ২০১০ সাল থেকে। সে সময়ের ধসের পর আর দীর্ঘমেয়াদি ঘুরে দাঁড়াতে বাজার। এ পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। ঢেলে সাজানো হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এছাড়া প্রণোদনা হিসেবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ফোর্স সেল বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও কোটার ব্যবস্থা করা হয়। আনা হয় বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে সংশোধন। বিনিয়োগকারীরা যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেজন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়।
সম্প্রতি বাজার স্থিতিশীল করার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ মুক্ত আয় ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকায় উন্নীত করা, নগদ লভ্যাংশের প্রতি উদ্যোক্তাদের মনোযোগ বাড়াতে বোনাস লভ্যাংশ ও রিটেইনড আর্নিসের ওপর ১০ শতাংশ করারোপ অন্যতম। এছাড়া পুঁজিবাজারে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়ে সৃষ্ট নৈরাজ্যতা দূরীকরণে নেওয়া পদক্ষেপসহ আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেওয়া বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন পণ্য হিসেবে-স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, ডেরিভেটিভস, শর্ট সেল ও ইনভেস্টমেন্ট আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাসহ নানা পদক্ষেপ। কিন্তু এর কোনো কিছুতেই বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার ঘুরে না দাঁড়াতে না পারার প্রধান কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। মূলত তাদের আস্থা না থাকার কারণেই বাজার তার স্বরূপে ফিরতে পারছে না।
জানতে চাইলে ডিবিএ’র সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বিনিয়োগকারীদের উচিত যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। কিন্তু এটা না করে তারা অল্পতেই ভীত হয়ে পড়েন। লোকসানে হলেও শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হতে চান তারা, যার প্রভাবে সেল প্রেসার বাড়ে। ফলে বাজারও নি¤œমুখী হয়।

সর্বশেষ..