পত্রিকা

পথশিশুদের জীবন

এম জসীম উদ্দীন: সার্ক ফোয়ারার সামনে একদল শিশু-কিশোর বসে আছে। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে তারা ছুটে যায়। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ ফল বিক্রি করে, আবার কেউবা বই বিক্রি করে। তাদের সবারই জীবন একটি বেদনাহত অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

১২ বছর বয়সী রনি তার বাবাকে কখনও দেখেনি। জšে§র আগেই তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের কাছেই বেড়ে উঠছিল সে। কিন্তু মা অন্যের বাসায় কাজ করেন বলে প্রায়ই তাকে বাসায় একা থাকতে হয়। মাঝেমধ্যে মা তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, কিন্তু সেখানেও বিপত্তি দেখা দেয়। ওই বাসাগুলোর ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে রনির ঝগড়া বেধে যেত। তাই বাড়ির গৃহকর্ত্রীরা রনিকে কাজের সময় বাসায় নিতে নিষেধ করেন। সেখান থেকেই বিপত্তির শুরু।

রনির একা একা বাসায় থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে সে আশপাশের শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে ওঠে। কিন্তু রনির জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যখন তার মা মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর রনি পথশিশুতে পরিণত হয়। বস্তির অন্য ছেলেদের সঙ্গে মিশে সে বিভিন্ন অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। প্রথম দিকে সে নেশা না করলেও এখন সে পুরোদমে নেশাগ্রস্ত শিশু।

বাংলাদেশে পথশিশুদের বড় অংশই রয়েছে রাজধানী ঢাকায়। ফেলে দেয়া খাবারে তাদের ক্ষুধা মেটে আর ফেলে দেয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ ও বিক্রি করাই তাদের প্রধান পেশা। তাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। ফুটপাত, পার্ক অথবা যেকোনো খোলা জায়গায়ই তারা থাকে। এই পথশিশুদের কেউ ভেঙে যাওয়া পরিবার থেকে বের হয়ে আসে; কেউ অভাবের তাড়না, কেউবা নদীভাঙনের শিকার হয়। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, মূলত দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা পথশিশুতে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া বাবা-মায়ের বিয়েবিচ্ছেদ বা একাধিক বিয়ে, তাদের মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হারিয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা পথশিশুতে পরিণত হয়।

বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের পথশিশুদের নিয়ে ডয়সে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর পরিচালক (শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার-বিষয়ক সুশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, শিশুরা যত ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে তার সবই আছে পথশিশুদের। বিশেষ করে অধিকারের জায়গা থেকে সব ধরনের ঝুঁকিতে থাকা শিশুরাই পথশিশু।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের কল্যাণে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন করেছিলেন, যার মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি আদায়, সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা ও খারাপ কাজে ব্যবহার হওয়া প্রভৃতি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা যায়।

সরকার পথশিশুদের উন্নয়নে শিশুবান্ধব বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পথকলি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে। পরে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট নামকরণ করা হয়। মূলত ভাগ্যহত, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত, হতদরিদ্র এবং নিজ প্রচেষ্টায় ও শ্রমে ভাগ্যোন্নয়নে প্রয়াসী শিশু-কিশোরদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাই শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের লক্ষ্য। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ‘বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ, ২০১৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পথশিশুর পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ২০১৬ সালে পথশিশুদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। এরই মধ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পথশিশুদের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়ন করেছে, যা চলমান রয়েছে। তাছাড়া ২০১৪ সালের মার্চে মাত্র ১০ টাকায় পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের মতো কিছু সংস্থা এবং মানবাধিকার কর্মীরা সীমিত পরিসরে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তারা পথশিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগও করে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে টাকা দিয়েও সহায়তা করছে। এছাড়া কিছু কিছু এনজিও পথশিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করেছে। একটি শিশুর খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, নিরাপত্তা ও শিক্ষার অধিকার রয়েছে। পথশিশুরা এর কিছুই পাচ্ছে না। তার ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে পথশিশুরা। ফলে মাদক এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

আমাদের দেশে অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে পথশিশুদের জন্য কিছু কিছু কাজ করছেন। কেউ ঈদের সময় নতুন পোশাক কিনে দেন, অনেকে খেলাধুলার আয়োজন করেন, আবার অনেকেই পথশিশুদের জন্য স্কুল খুলে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছেন। এসব পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদে কোনো উপকার হয় না। যথাযথভাবে পুনর্বাসন না হওয়ায় তারা আবার আগের জীবনেই ফিরে যায়।

২০১৫ সালের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ছিল ১০ লাখ, যার মধ্যে আড়াই লাখের বেশিই ছিল রাজধানীতে। বর্তমানে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কেউ বলেন, ২১ লাখ আবার কেউ বলেন ২৪ লাখ। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশটির সর্বশেষ আদমশুমারিতে ভাসমান মানুষ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, দেশে চার লাখের মতো পথশিশু রয়েছে, যার  অধ্যেকেরই অবস্থান রাজধানীতে। অন্যদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে এবং সারাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পথশিশুদের ৫১ ভাগ ‘অশ্লীল কথার শিকার’ হয়। শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ২০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয় মেয়েশিশুরা। শতকরা ১৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ পথশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আর মেয়েশিশুদের মধ্যে ৪৬ ভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার।

একটি শিশু কখনও পথশিশু হয়ে জন্ম নেয় না। জন্মের সময় প্রতিটি শিশুই তার নাগরিক অধিকার নিয়েই জন্ম নেয়। আজ যে শিশু ভালোভাবে কথা বলতে শেখেনি তাকেও জীবিকার তাগিদে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। তার কাছে জীবনের মানেই হলো ক্ষুধা নিবারণের জন্য পথে পথে ভিক্ষাবৃত্তি করে বেঁচে থাকার লড়াই। আজকের শিশুই যেহেতু আগামী দিনের কর্ণধার, তাই পথশিশুর অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পথশিশুদের শৈশব কেড়ে নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়া কখনও ঠিক হবে না।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..