প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পথশিশুদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

হাসনাত জাহান সিফাত: ‘শিশু’ শব্দটি শুনলেই আমাদের কল্পনার দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে এক ঝাঁক দুরন্ত শিশুদের দুষ্টমি আর খুনসুটির নানা দৃশ্য। ভেসে ওঠে নিজেদের শৈশবের স্মৃতি। শিশু শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ও ভবিষ্যৎ।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশু। সাধারণত সব শিশুই এ বয়সে পরিবারের অটুট বন্ধনে থেকে মা-বাবার নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতার জন্য সবাই মা-বাবার ছায়ার নিচে সুন্দর একটি জীবন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না।

যে বয়সে তাদের কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তারা তাদের কাঁধে একটি ধুলোমাখা বস্তা ঝুলিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। যে বয়সে তাদের পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সে তারা পথে পথে, খোলা আকাশের নিচে প্রতিনিয়ত বাঁচার লড়াই করে যায়। তারা বেড়ে ওঠে নানা অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। এই বয়সে তাদের পরিচয় হয় পথশিশু হিসবে। খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী (রনবী) এসব শিশুদের নাম দিয়েছেন ‘টোকাই’। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে টোকাই শব্দটির অর্থ বলা হয়েছেÑ‘স্থায়ী ঠিকানা ও পরিচিতিহীন অনাথ ছেলে-ছোকরা যারা পথের ধারে ফেলা জঞ্জাল থেকে (ডাস্টবিন থেকে) পরিত্যক্ত শিশি-বোতল কিংবা কাগজের টুকরা সংগ্রহ করে, এমনকি খাদ্য কুড়িয়ে খায়; টোকায় বা টোকানোর কাজ করে যে’। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনমতে, শূন্য থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত যেসব শিশু রাস্তায় দিনাতিপাত করে, যাদের নিজেদের বা পরিবারের কোনো স্থায়ী আবাসস্থল নেই, তারাই পথশিশু। পথশিশু কিংবা টোকাই শুধু একটি শব্দ নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে অনেক বেদনা, অবহেলা, অপমান আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

অধিকাংশ পথশিশুর নিজস্ব কোনো পরিবার নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা পরিবার থেকে পালানো কিংবা মা-বাবা তাড়ানোও হয়। অনেকের জš§ ও বেড়ে ওঠা সবটাই রাস্তায়। সাধারণত বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ স্থান বিশেষ করে রেলস্টেশন, বাস স্টপেজ, লঞ্চ টার্মিনাল প্রভৃতি জায়গায় পথশিশুদের দেখা পাওয়া যায়। এসব শিশু খাবারের টাকা জোগাড়ের করার জন্য রাস্তা থেকে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য কুড়িয়ে নিয়ে ভাঙারির দোকানে গিয়ে বিক্রি করে। অনেক সময় তারা ফুল, বেলুন, বই, পত্রিকাসহ নানা জিনিস ফেরি করে রাস্তায় রাস্তায়। আবার কখনও তারা সাহায্যের আশায় পথচারীদের কাছে হাত বাড়িয়ে দেয়। পথশিশুরা ঠিকমতো দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারে না। কোনো সময় এক বেলা জুটলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে অভ্যস্ত এসব শিশুকে ক্ষুধার তাড়নায় ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার কুড়িয়ে খেতেও দেখা যায়।

পরিবারের স্নেহবঞ্চিত এসব শিশু শিক্ষার আলো থেকেও বঞ্চিত। অবশ্য যাদের দু’টুকরো কাপড়ের বড্ড অভাব, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, তাদের জন্য পড়াশোনা অনেকটা রাতের স্বপ্নের মতো। বর্তমানে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের অক্ষরজ্ঞান দানের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

পথশিশুদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ১০ থেকে ১২ বছর বয়সেই ড্যান্ডি, সিগারেট, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময় ফেনসিডিল, হেরোইনসহ অনেক ধরনের মাদক গ্রহণেও তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আবার অনেক শিশু মাদক চোরাচালানের কাজও করে। তারা নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এমন একটি জগতের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, যা থেকে ফিরে আসা হয়তো কারও পক্ষে আর সম্ভব হয় না।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’ (সিপ) ২০১৫ সালে ‘পথশিশুদের অমানবিক জীবন ও বিভিন্ন সমস্যা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, দেশে বর্তমানে ১০ লাখ পথশিশু আছে। পথশিশুরা সাধারণত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত, যার ফলে তারা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন রকম ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের বড় একটি অংশ অর্থের অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারে না। সিপ-এর ‘পথশিশুদের অমানবিক জীবন ও বিভিন্ন সমস্যা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৫ শতাংশ পথশিশু অসুস্থ হলে টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে যেতে পারে না। অসুস্থ হলে প্রায় ৫৪ শতাংশ পথশিশুকে দেখার কেউ নেই। তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়মিত গোসল করতে পারে না। ৩৫ শতাংশ পথশিশু খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। ৪১ শতাংশ পথশিশুর রাতে ঘুমানোর জায়গায় নেই। পথশিশুদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মাদকাসক্ত। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৪ শতাংশ পথশিশু ধূমপান করে।

পথশিশুরা অন্য আট-দশটা শিশুর মতো করে বেড়ে ওঠে না। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ, পৌষ-মাঘের হাড়কাপানো শীত আর তীব্র ঝড়কে সঙ্গী করে বাঁচতে হয় পথশিশুদের। এসব ছিন্নমূল অসহায় শিশুদের সব ঋতুতেই কষ্ট করতে হয়। পরিবারবঞ্চিত বলে পথশিশুরা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কারও কাছ থেকে ভালো কোনো পরামর্শ কিংবা দিকনির্দেশনা পায় না, যার ফলে তারা ছুটে চলে একটি অজানা গন্তব্যের দিকে, যার পরতে পরতে শুধু অন্ধকার।

মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এসব শিশুর পুনর্বাসনে আমাদের কাজ করতে হবে। সুখী ও সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। পথশিশুদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে কখনোই সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া যাবে না। পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে একটি বিজ্ঞানসম্মত বহুমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং তার সঠিক বাস্তবায়নও করতে হবে। সঠিক পরিচর্যা পেলে পথশিশুরা আর দেশের বোঝা থাকবে না। তারা পরিণত হবে দেশের জনসম্পদে।

পথশিশু নামক অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া শুধু সরকারের একার কাজ নয়। এজন্য সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সব নাগরিককে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত এসব শিশুর দিকে বাড়িয়ে দিতে হবে মমতার হাত। নিজের সন্তানকে আমরা যেভাবে ভালোবাসি, তেমনি তাদেরও ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে হবে। আমরা যদি এ সংকট নিরসনে একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তাহলেই আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

শিক্ষার্থী

ফাজিলপুর ওয়ালিয়া ডিগ্রি মাদরাসা, ফেনী