সম্পাদকীয়

পদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের লবিং কাম্য নয়

শ্রেণিকক্ষে পাঠদানসহ বিভিন্ন কর্তব্য মেনে নিয়ে একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণপ্রজাতন্ত্রের গবেষক হিসেবে যোগ দেন। এ শপথটি ইদানীং কালের উল্লেখযোগ্য শিক্ষকের কাছে কেবলই স্বাক্ষরসর্বস্ব হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিন হাজার শিক্ষক এ কার্যক্রমের বাইরে রয়েছেন। অন্তত চার হাজার শিক্ষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে একাধিক খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন চাকরি করছেন। তাছাড়া নিয়ম উপেক্ষা করে তারা পদ-পদবি, প্রকল্প প্রাপ্তি ও ব্যবসার পেছনে ছুটছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের এক ভাষণে। গত শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম সমাবর্তনে তিনি বলেছেন, প্রশাসনিক পদ-পদবির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা এখন শিক্ষা কার্যক্রমের চেয়ে লবিং-তদবিরেই বেশি সময় দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে তাঁর এ ভাষ্য যথার্থই মনে করি। একই সঙ্গে উন্নত গবেষণালব্ধ শিক্ষার মাধ্যমে জাতি গঠনের মহান দায়িত্ব যে শিক্ষকদের ওপর ন্যস্ত, তাদের এহেন কার্যক্রম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ পরিস্থিতির ত্বরিত অবসান হওয়া জরুরি বলে মনে করি। এই গড্ডালিকার প্রবাহ থামাতে হলে সরকার ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগবাণিজ্যের কেলেঙ্কারি বহুবার চাউর হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও পাওয়া যায়। এসব শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগী হওয়া ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ঝরে পড়েন; সেই স্থলে সামান্য পড়ালেখা আর লেজুড়বৃত্তির মধ্য দিয়ে অযোগ্য শিক্ষার্থীরা প্রতারণাপূর্ণ চমৎকার সনদসর্বস্ব ফল নিয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। ফলে একটি দুষ্টচক্র সৃষ্টি হচ্ছে।

শিক্ষক-শিক্ষক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এখন মর্যাদা কিংবা জ্ঞান ও শিক্ষার পর্যায় ছাপিয়ে গিয়ে স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এই শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যেও গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য ও রাষ্ট্রপতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখায় শহীদ শামসুজ্জোহা, ড. হাবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার ও মীর আবদুল কাইয়ুমের অবদানকে স্মরণ করেছেন। তবে জাতি হিসেবে আমাদের এ পর্যন্ত উঠে আসতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিখ্যাত ও নাম না-জানা অসংখ্য শিক্ষক আমাদের সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভক্তির জায়গা দখল করে আছেন। তাই মত-পথের ভিন্নতা ভুলে, ব্যক্তিস্বার্থে কুহেলিকা ছিন্ন করে, আদর্শকে সমুন্নত রেখে আমাদের শিক্ষাগুরুর শির শিক্ষকরা তাদের নিজেদের মান-মর্যাদার জায়গা ফিরিয়ে আনবেন বলে প্রত্যাশা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..