দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে অস্বাভাবিক নির্মাণ ব্যয়!

ইসমাইল আলী: রেলের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এজন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি এ খাতে একের পর এক নেওয়া হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প। এর মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি। এর আওতায় ঢাকা থেকে মাওয়া, ভাঙ্গা, নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। যদিও এ প্রকল্পে ব্যয় নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এছাড়া প্রকল্পটির কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় চলমান অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটির আওতায় ঢাকা-মাওয়া-যশোর রুটে সিঙ্গেল লাইন ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি)। জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।

কঠিন শর্তের ঋণে (বায়ার্স ক্রেডিট) এ রেলপথটি নির্মাণে সিআরইসির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ২০১৬ সালের আগস্টে। সে সময় প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছিল ২৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি রেলপথ নির্মাণ ব্যয় পড়ছে ১২৮ কোটি ৪৯ কোটি টাকা। যদিও রেলপথটি নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এদিকে খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৫ সালে। ভারতের ইরকন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সে বছর অক্টোবরে চুক্তি সই করে রেলওয়ে। ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ এ রেলপথ নির্মাণের চুক্তি মূল্য এক হাজার ২৭৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ভারতের ঋণে (এলওসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এলওসির আওতায় চলমান আরেক প্রকল্প হলো ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ। ৪৮ কিলোমিটার এ রেলপথ নির্মাণে চুক্তি হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। এক হাজার ৩৯৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় যৌথভাবে এ রেলপথ দুটি নির্মাণ করছে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও কল্পতরু গ্রুপ। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৯ কোটি চার লাখ টাকা। ডুয়েলগেজ হওয়ায় এক্ষেত্রে ব্যয় খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের চেয়ে কিছুটা বেশি পড়ছে বলে জানান রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

এর বাইরে ভারতের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনে নির্মাণ করা হচ্ছে চিলাহাটি থেকে চিলাহাটি বর্ডার পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ। ৯ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের চুক্তি মূল্য ৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে মাত্র সাত কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশের ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল এ রেলপথটি নির্মাণ করছে।

রেলওয়ের এ হিসাবে ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্পের চেয়ে তিন দশমিক ৪২ গুণ বেশি ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটি। আর খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণের সঙ্গে তুলনা করলে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে গড় ব্যয় পড়ছে ছয় দশমিক ৫১ গুণ। এছাড়া চিলাহাটি-চিলাহাটি বর্ডার প্রকল্পের সঙ্গে তুলনায় এ ব্যয় বেশি পড়ছে প্রায় সাড়ে ১৬ গুণ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে নতুন কোনো রুটে রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যয় কিছুটা বেশি পড়ে। কারণ স্টেশন, বিল্ডিংসহ অন্য সব অবকাঠামো নতুন করে নির্মাণ করতে হয়। পদ্মা রেল সংযোগ রুটটিও একেবারে নতুন। তাই ব্যয় কিছুটা বেশি পড়ছে।

যদিও রেলওয়ের সাবেক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের মতো খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথও সম্পূর্ণ নতুন। তাই পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পকে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় এক দফা বাড়ানো হয়েছে। এতে ঢাকা-মাওয়া-যশোর রেলপথ নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণ দেবে চীন। বাকি ১৮ হাজার ২১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে। যদিও ২০১৬ সালে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্পের ব্যয় চার হাজার ২৫৮ কোটি টাকা বেড়ে গেছে।

এদিকে প্রকল্পটির ব্যয় আরেক দফা ব্যয় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন ছাড়াই ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে ৬৪০ একর অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণে দরকার হবে ৯৪০ কোটি টাকা। এছাড়া ইউটিলিটি শিফটিং বাবদ অতিরিক্ত ২৫২ কোটি টাকা ও তৃতীয় পক্ষ পরামর্শক বাবদ আরও ২ কোটি টাকা দরকার হবে। এছাড়া প্রকল্পটির নকশা জটিলতার কারণে রেলপথ নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়বে। এর বাইরে বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণেও প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে। রেলপথটি নির্মাণের শেষদিকে এসব ব্যয় সমন্বয় করা হতে পারে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..