সাক্ষাৎকার সারা বাংলা

পরিকল্পিতভাবে শহরকে গড়ে তোলার চেষ্টা করব

আগামী ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে দুই হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। আসন্ন নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে শেয়ার বিজের মুখোমুখি হন এই দুই মেয়র প্রার্থী। রেজাউল করিমের সাক্ষাৎকার ছাপা হচ্ছে আজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী

শেয়ার বিজ: কেন আপনি এ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হলেন?

রেজাউল করিম চৌধুরী: আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেছি। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে আমি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা যেদিন ঘোষণা করেন, সেই ছয় দফা উপলক্ষে মুসলিম হাইস্কুল মাঠে বিশাল জনসভা। পালিয়ে গেলাম স্কুল থেকে বই-খাতা নিয়ে। শুনলাম ছয় দফা। তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। ১৯৬৬ সাল, শুনে আমি বাসায় এসে নিজে নিজে চিন্তা করলাম, একটা দেশে দুটি প্রশাসন, দুটি স্টেট ব্যাংক, দুটি পার্লামেন্টারি কীভাবে হবে? আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি আমাকে বললেন, ‘বুঝবে। এখন বুঝবে না।’ যা হোক পরে এসে বুঝতে পারলাম আরকি। ১৯৬৭ সাল থেকে আমি ছাত্রলীগে যুক্ত হলাম। ’৬৮, ’৬৯, ’৭০-এ আমি চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি, অবিভক্ত চট্টগ্রামের অর্থ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক। আওয়ামী লীগ করেছি, যুবলীগ করেছি, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের তো একটা প্রত্যাশা থাকে। সেটা হচ্ছে কোনো একটা বৃহত্তর পরিসরে গিয়ে কাজ করা, জনগণের সেবা করা। এরকম কোনো কিছু যদি আমার জীবনে আসে, আমি মানুষের জন্য কাজ করতে পারব। তার আগে আমি উপনির্বাচনে মনোনয়ন চেয়েছিলাম, ২০১০ সালেও মেয়রের জন্য মনোনয়ন চেয়েছিলাম, তার আগেও মনোনয়ন চেয়েছিলাম। এবারো মনোনয়ন চেয়েছি। নেত্রী ভালো মনে করেছেন, আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে তিনি মূল্যায়ন করেছেন। মনোনয়ন দিয়েছেন।

শেয়ার বিজ: নির্বাচনের জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন?

রেজাউল করিম চৌধুরী: প্রস্তুতি চলছে। কারণ জনগণের সঙ্গে তো আমার সম্পৃক্ততা আগে থেকেই ছিল। আমি যদি হঠাৎ করে নেমে পড়তাম, তাহলে প্রস্তুতি নিতে একটু সময় লাগত। আমি এই শহরেরই সন্তান। এখানে জš§গ্রহণ করেছি, এখানেই বড় হয়েছি। রাজনীতি ছাত্রজীবন থেকেই করেছি। প্রত্যেক পাড়া ও মহল্লা আমার নখদর্পণে আছে। মানুষ আমাকে সার্বজনীনভাবে না চিনলেও মোটামুটি চেনে।

শেয়ার বিজ: সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনের উপনির্বাচন এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে তেমন উপস্থিতি নেই। ২২-২৩ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে! নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আপনার কৌশল বা উদ্যোগ কী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: আমার উদ্যোগ তো নয়, পার্টির উদ্যোগ। আমি পার্টির জন্য এসেছি। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে আমরা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি। ইভিএম সম্পর্কে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, এই আতঙ্কটা যাতে কেটে যায়, সে ব্যাপারে মোটামুটি আমরা কাজ করছি। এলাকায় আমাদের নেতারা, ওয়ার্ড আওমীম লীগ, ছাত্রলীগসহ যে অঙ্গসংগঠনগুলো আছে, তারা কাজ করছে। আশা করি, ভোটার সমাগম হবে, যেহেতু এটা একটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

শেয়ার বিজ: এখন নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ কেমন দেখছেন?

রেজাউল করিম চৌধুরী: পরিবেশ তো এখন ভালোই দেখছি। কোথাও সে রকম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দেখছি না। যার যার কাজ সে সে করছে। ৯ মার্চ প্রতীক বরাদ্দ হবে, ১০ মার্চ আমরা প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণায় নেমে যাব।

শেয়ার বিজ: জনবান্ধব শহর চট্টগ্রাম গঠনে আপনার ভাবনা কী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে শহর জনবান্ধব হবে। সবাইকে নিয়ে সম্মিলিত প্রয়াসটা তো জনবান্ধব। আপনি সাংবাদিক, আপনার পরামর্শ আমি নেব। আরেকজন সাহিত্যিক, তার পরামর্শও আমি নেব। সবাইকে নিয়ে তো আমি চলব।

শেয়ার বিজ: নির্বাচনের পরিবেশ আপনার অনুকূলে আছে কিনা?

রেজাউল করিম চৌধুরী: এটা তো আমি আগেই বলেছি। পরিবেশ অনুকূলে না থাকার কোনো কারণ নেই। কারণ আমি তো রাজনীতির ময়দানে নতুন নয়। হ্যাঁ, সবার সঙ্গেই কুশল বিনিময় হচ্ছে। ভালোই তো লাগছে। হ্যাঁ, আমি আশাবাদী।

শেয়ার বিজ: নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনায় আপনার চ্যালেঞ্জ কী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: কাজ পরিচালনায় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কারণ আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন এবং বড় সংগঠন। এখানে হাজার হাজার কর্মী। আর এটা আমার কোনো ব্যক্তিগত নির্বাচন নয়। এটা দলীয় নির্বাচন। দলগতভাবে নির্বাচন হচ্ছে। যেহেতু দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক স্তরের নেতাকর্মী, অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে-ময়দানে কাজ করছে। তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ আমি দেখছি না। আর প্রতিপক্ষ যারা আছেন, সবাইকে আমি সমান প্রতিপক্ষ মনে করি।

শেয়ার বিজ: সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আপনার সুপারিশ কী কী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মানুষ সুন্দরভাবে ভোট দিতে আসবে। সেটার জন্য নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। মানুষ যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে। মানুষের প্রত্যাশা তো এটাই। তারা যাতে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটটা দিতে পারে। এই তো।

শেয়ার বিজ: ভোটাররা কেন আপনাকে ভোট দেবে?

রেজাউল করিম চৌধুরী: এটা তো আমি আগেই বলেছি, আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। ছয় দফা আন্দোলন করেছি, ’৬৯-এর গণআন্দোলন করেছি, ’৭০-এ নির্বাচন করেছি। জাতির চরম দুর্দিনে ’৭১-এ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এর প্রতিবাদে আমি প্রতিরোধ সংগ্রামে প্রথম সারির একজন নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। এরশাদ বিরোধী, ’৭১-এর সরকারবিরোধী জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছাড়া চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সমস্যা নিয়েও আমি কিন্তু কাজ করেছি। আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। চট্টগ্রামের উন্নয়নের দাবিতে কোনো সংগঠন আমি প্রতিষ্ঠা করার আগে ছিল না। এটা কিন্তু অনেকের নলেজে নেই। তার আগে ছিল একটা শত নাগরিক কমিটি, তাও কিছু সুশীল ও শতজন বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে। কিন্তু আমিই প্রকাশ্যে সাধারণ চট্টগ্রামবাসীকে নিয়ে নাগরিক পরিষদ গঠন করেছি এবং চট্টগ্রামের দুঃখ নামে খ্যাত চাক্তাই খাল সংগ্রাম কমিটি প্রতিষ্ঠা করি। এ দুটি সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলাম আমি। এগুলো নিয়ে মশাল মিছিল, হরতাল পর্যন্ত করেছি। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে পানি সমস্যা ছিল, তৎকালে বিদ্যুৎ সমস্যা ছিল। এখনও আমি গ্যাস সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করছি। আবাসিক গ্যাস বন্ধের বিরুদ্ধে আমি আন্দোলন করেছি। জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আমি বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-মিটিং করেছি। আমি মনে করি, মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। আমার আমাকে, আমার ওপর আস্থা রাখে। আমিও মানুষের বিবেকে স্থান করে নিতে পেরেছি বলে আমি মনে করি। তাই সেই চিন্তা করে, তাদের দুঃখ-দুর্দিনের একজন বন্ধু হিসেবে এবার চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি। সে সুযোগ তারা হারাবে বলে আমি মনে করি না। তারা আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে।

শেয়ার বিজ: জয়ের ব্যাপারে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।

শেয়ার বিজ: ভোটারদের উদ্দেশে আপনার আহ্বান কী?

রেজাউল করিম চৌধুরী: ভোটারদের উদ্দেশে আমার আহ্বান হচ্ছে, আমি যদি ইনশাআল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হতে পারি, সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে, সর্বস্তরের সব শ্রেণির মানুষের পরামর্শে একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। কারণ চট্টগ্রামের চেহারা আজকে বিপন্ন হয়ে গেছে। সমগ্র চট্টগ্রাম ছিল একট পর্যটন নগরী। এ পর্যটন নগরী আজকে ধ্বংস। পাহাড়গুলো কেটে সাবাড় করে দেওয়া হচ্ছে। কর্ণফুলী নদী আমাদের প্রাণ। কর্ণফুলী নদী নাব্য হারাচ্ছে। এটা দূষিত ও দখল হচ্ছে। কর্ণফুলী নদী মরে গেলে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে, বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে যাবে। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বন্দর শেষ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা সমস্যা, মশার সমস্যা, রাস্তাঘাটের সমস্যা, স্যুয়ারেজের সমস্যা আছে। যুবকের মাদকাসক্তের গভীরে কী আছে? নগরে কোনো মাঠ নেই, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। আমি ইনশাআল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হলে সম্মিলিত, সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে একটা সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শহরকে গড়ে তোলার চেষ্টা করব। সবার বক্তব্যকে যদি আমি এক জায়াগয় এনে ইমপ্লিমেন্ট করতে পারি, তাহলে চট্টগ্রাম একটি পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে উঠবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..