প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় হোক পরিচ্ছন্ন নগরী

নাজমুন নাহার সুপ্তি: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় এক ব্যাগভর্তি পলিথিনে গৃহস্থালির বর্জ্য পড়ে আছে। সেটা থেকে দুর্গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে; মানুষজন খুব কষ্টে নাক মুখ চেপে তার পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। এ যেন আমাদের স্বাভাবিক দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া নিত্য এক সাধারণ গল্পকথা।

অনেকেই ময়লা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে পয়ঃনিষ্কাশন নালায় ময়লা ফেলেন। ফলে নালায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আর্বজনা ফেলার ডাস্টবিনের চারপাশে ও এত পরিমাণ বর্জ্য থাকে, যেকোনো মানুষ সেখানে গিয়ে ময়লা ফেলার পরিবেশ পায় না কিংবা কিছু জায়গায় যথাযথ পরিবেশ পেলেও ডাস্টবিন থেকে আগের দিনের জমানো বর্জ্য সময়মতো সরিয়ে নেয়া হয়নি। এই জিনিসগুলোর জন্য যে যথাযথ ব্যপস্থাপনা রয়েছে সেটা আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। এমনটা প্রায় সময়েই হয় যেন রাস্তায় কিছু খেয়ে ডাস্টবিনের কাছে গেলাম চিপসের প্যাকেট ফেলতে আর গিয়ে দেখি ডাস্টবিন আগে থেকেই পূর্ণ হয়ে আছে। তারপর সেই চিপসের প্যাকেট টা এখন কোথায় ফেলব? বাধ্য হয়েই অনেকে তখন রাস্তায় ফেলেন। এসব ঘটনাগুলো খুব অপ্রীতিকর ও বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রতিদিন ৫ হাজার মেট্রিক টনের ওপর বর্জ্য তৈরি হয় রাজধানী ঢাকায়। প্রতিদিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য তৈরির পরিমাণও বেড়েই চলছে। ময়লা ফেলার নির্ধারিত জায়গা ও পর্যাপ্ত আঁস্তাকুড়ের (ডাস্টবিন) এর যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা না থাকার জন্য যত্রতত্র বর্জ্যে স্ত‚প জমে ছোটখাটো একটা আবর্জনার টিলা তৈরি হয়ে যায়। নিয়মিত এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব স্ত‚প থেকে যেমন একদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পথচারীদের অসুবিধার কারণ সৃষ্টি করছে তেমনি তৈরি করছে পরিবেশ এর ভারসাম্য নষ্টের কারণ। এসব ময়লার স্ত‚প থেকে তৈরি হওয়া মিথেন গ্যাস ও লিচেট (ময়লা থেকে নিষ্কাশিত তরল) সহজেই পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি রোগজীবাণু বহনকারী বিভিন্ন কীটপতঙ্গকে আকর্ষণ করে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এছাড়া বর্জ্যে দূষণ থেকে পেটের পীড়া, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট, আলসার, গ্যাস্ট্রিক এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়ার মতো কঠিন অসুস্থতার শিকার হয় মানুষ।

আমাদের মোট বর্জ্যরে ৩৭ শতাংশ তৈরি হয় রাজধানী ঢাকায়। যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এটি আমাদের নগর জীবনের এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে আমরা মূলত আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। সাধারণত মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্টি হওয়া অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলোকে বুঝানো হয়ে থাকে; ওই বস্তুগুলোর থেকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষতিকারক প্রভাব প্রশমিত করার জন্য, কিংবা পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য এদের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ উপযোগী করে তোলা হয়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণত ল্যান্ডফিলিং পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হওয়া অধিক পরিমাণ বর্জ্য পরিকল্পিত  ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি কোনো ল্যান্ডফিলে নিরসন করা হচ্ছে না। অপরিকল্পিত ল্যান্ডফিলগুলো থেকে সংগৃহীত কঠিন বর্জ্যরে মাত্র ৫৫ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং এদের থেকেও মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন উপাদানে রূপান্তর করা যাচ্ছে। ঢাকার পুরোনো ল্যান্ডফিলগুলো বর্তমানে বর্জ্যে পরিপূর্ণ হয়ে আছে এবং সিটি করপোরেশনগুলো আধুনিক টেকসই ল্যান্ডফিল ব্যবহারের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করার পরিবর্তে কেবল আরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কারওর সমাধান মূলক যথাযথ দৃষ্টি না থাকায় নগর জীবনে এ সমস্যা  এক বিষন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ইতোমধ্যে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই বর্জ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে বর্জ্যকে যেভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যেতে পারে পৌর এলাকার বর্জ্য, বাণিজ্যিক এলাকার আবর্জনা, শিল্প এলাকার বর্জ্য। এ ছাড়া যেখানে শেষ গন্তব্যস্থল হিসেবে ময়লাকে মূলত মাটিচাপা দেয়া হয় সেখানে শ্রেণিবিভাগটা হতে পারেÑপচনশীল এবং অপচনশীল। যে শহরগুলো তে বর্জ্য পোড়ানো হয় সেখানে শ্রেণিবিভাগটা এমন হয়  দহনযোগ্য, অদহনীয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, প্লাস্টিক, পুরোনো কাপড়, খবরের কাগজ, পেট-বোতল, কাচের বোতল, ধাতব বস্তু, অতিরিক্ত বড় ময়লা, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি প্রভৃতি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আবর্জনার গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার থাকাটা খুব দরকার।

বর্জ্যরে গঠন সম্পর্কে জানার জন্য নি¤œলিখিত বৈশিষ্টগুলো জানতে হয়Ñ আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণ। বর্জ্যকণার আকার বিশ্লেষণ। বর্জ্যরে জলীয় অংশ। বর্জ্যরে ঘনত্ব। আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণে যেসব আলাদা রকমের উপাদান একত্রে মিশে আবর্জনা তৈরি হয়েছে সেগুলো চিহ্নিতকরণ এবং এগুলোর (শতকরা) অনুপাত নির্ণয় করা হয়। এ অংশের অধীনে বর্জ্যরে শতকরা ওজনের তালিকা (তথ্যসূত্র: আহমেদ এবং রহমান, ২০০০, ডধঃবৎ ঝঁঢ়ঢ়ষু ধহফ ঝধহরঃধঃরড়হ, ওঞঘ-ইধহমষধফবংয) থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে খাবার ও তরকারি বর্জ্য প্রায় ৭০ শতাংশ যেখানে কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী, প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ, কাচ ও সিরামিক বর্জের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪, ৫ ও দশমিক ২৫ শতাংশ। তাই আমাদের গৃহস্থালি বর্জ্যরে যথাযথ ব্যবস্থাপনা আমাদের অর্বজনার মোট পরিমাণ কমাতে পারে যা আমাদের সুন্দর, আবর্জনার দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ উপহার দিতে পারে।

এই গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি আমরা সবাই নিজ ঘর থেকেই শুরু করতে পারি জার্মান পদ্ধতি অনুসরণ করে। এই গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি আমরা সবাই নিজ ঘর থেকেই শুরু করতে পারি জার্মান পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ পদ্ধতি অনুসারে-রান্নাবান্নার সময় তৈরি বর্জ্য তা এক ব্যাগে রাখা, আর কাগজপত্র আরেক ব্যাগে রাখা এরপর রং অনুযায়ী ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কনটেইনারে সেগুলো ফেলতে হবে। রঙের বিষয়টিও জটিল নয়, কালো রঙের কনটেইনারে ফলতে হবে রান্নাবান্নার সময় উৎপাদিত জৈব আবর্জনা, কাগজপত্রের জন্য নীল কনটেইনার আর প্লাস্টিক দ্রব্যের জন্য হলুদ কনটেইনার এই তিন ধরনের কনটেইনার প্রায় সব বাড়ির সামনেই কর্তৃপক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা গেলে আর আমাদের এদের ব্যবহার সম্পর্কে আইন করে যথাযথ নির্দেশ দেয়া হলে এবং আইন অমান্যে যথাযথ শাস্তির বিধান করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থা অনেক সহজেই সমাধানযোগ্য হবে বলে আশা রাখা যায়। এ ছাড়া রয়েছে কাচের বোতল ফেলার নির্দিষ্ট কিছু কনটেইনার বাদামি, সবুজ আর সাদা বা স্বচ্ছ বোতলগুলো রং দেখে ফেলতে হয় সেসব কনটেইনারে তবে ব্যাটারি, অ্যাসিড বা রঙের মতো দ্রব্য ফেলা যায় না এসব কনটেইনারে সেগুলোর জন্য আলাদা পাত্র এখানেই শেষ নয়, বাসার আসবাবপত্র পুরোনো হয়ে গেছে এবং সেগুলো ফেলে দিতে হবে; এসব জিনিস ফেলে দেয়ার জন্য ঠিক করা হবে নির্দিষ্ট কিছু দিন, যে দিনগুলোতে নগর কর্তৃপক্ষ বা যাদের সেসব জিনিস প্রয়োজন তারা তা নিয়ে যাবে। এখানে পুরোনো জামা কাপড় ফেলার জন্যও যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বা পার্কিং লটে এক ধরনের কনটেইনার থাকবে যেগুলোতে পুরোনো জামাকাপড়, জুতা ফেলা যায়। সেগুলো আবার দান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং ব্যবহার উপযোগী পোশাক গরিব-দুঃখীদের দান করা হবে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে ময়লা আর্বজনা ফেলার উদ্দেশ্য হচ্ছে নিখুঁত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনামুক্ত সুন্দর পরিবেশ তৈরি এবং সংগৃহীত আবর্জনা থেকে সর্বোচ্চ রিসাইক্লিং করা। এক্ষেত্রে পরিবেশ সুন্দর হাওয়ার পাশাপাশি আমাদের সমাজের অসচ্ছল মানুষকেও সাহায্য করা হবে। আর আমরা পাব পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থার সুন্দর আবাসিক ঢাকা নগরী। এজন্য অবশ্যই কর্তৃপক্ষের দৃঢ় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন, সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্মিলিত কাজই পারে আমাদের স্বাস্থ্যকর ঢাকার পরিবেশ উপহার দিতে।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়