প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিচয় সমস্যায় তাইওয়ানে অবস্থানরত হংকংবাসী

নাগরিকও নন, বিদেশিও নন

শেয়ার বিজ ডেস্ক: কেনেথ ইপ ও নাটালি ওং গত বছর শুরুর দিকে হংকং ছেড়ে তাইওয়ানে আসার সময় শুধু কয়েকটি ব্যাগ ও নকল আমন্ত্রণপত্র এনেছিলেন। প্রোটেক্ট আওয়ার চিলড্রেন নামে একটি সংগঠনের হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হওয়ার কারণে ২০১৯ সালে তারা হংকংয়ের পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।  মামলা থেকে মুক্তি পেলেও পুলিশ তাদের দাঙ্গাকারী হিসেবে চিহ্নিত করায় তারা নিজ দেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। এ কারণে তারা তাইওয়ানে পাড়ি জমান। এই দেশের সরকার তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়ার পর তারা হংকং ছেড়ে চলে আসেন।

দ্য গার্ডিয়ানকে ইপ বলেন, আমরা পর্যটকের ভান করি। তাইওয়ানে আসার পর নিজেদের মুক্ত মনে করি। তবে কয়েক দিন পর পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও শহরের অভাব অনুভব শুরু করি।

এই দম্পতির মতো হাজারো হংকংবাসী তাইওয়ানে পালিয়ে গেছেন। কেউ বিনিয়োগকারী, কেউ বা ব্যবসা, বা স্টুডেন্ট ভিসায় তাইওয়ানে এসেছেন। দেশটি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বেআইনিভাবে প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। তবে দেশটিতে কোনো শরণার্থী বা উদ্বাস্তু প্রোগ্রাম চালু নেই। দেশটির সংবিধান (১৯৪৭ সালে প্রণয়ন করে চীনের সরকার) অনুযায়ী, এখনও তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে চীন, যেখানে হংকংবাসীদের নাগরিক কিংবা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এতে উদ্বেগ বাড়ে হংকংবাসীর মধ্যে, যা আজও রয়ে গেছে। এ কারণে অনেকে তাইওয়ান ছাড়ছেন বা ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। তারা হংকং থেকে তাইওয়ানে আসার পর যুক্তরাজ্যের মতো দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন।

ইপ ও ওংয়েরও ব্রিটিশ পাসপোর্ট রয়েছে। তবে তারা তাইওয়ানের সমাজসেবায় নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী। ভাষাগত সমস্যা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকলেও তারা এখানে ভালো সময় কাটাচ্ছেন। রাজধানী তাইপেতে তাদের অ্যাপার্টমেন্টও রয়েছে।

১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ছিল যুক্তরাজ্যের অধীন। তারপর তারা হংকংকে চীনের কাছে ছেড়ে দেয়। ২০১৯ সাল থেকে সেখানে কোনো প্রতিবাদের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। গণতন্ত্রপন্থিদের জেলে বন্দি করা হচ্ছে। নতুন সুরক্ষা আইন পাস করে চীন তা কড়াভাবে বাস্তবায়ন করছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর প্রায় ৯০ হাজার মানুষ হংকং ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আসার জন্য আবেদন করেন। তাদের সবার কাছে ব্রিটিশ ন্যাশনাল (ওভারসিজ) পাসপোর্ট রয়েছে। বেইজিং এই নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালন করছে না। বিরোধিতা করলেই ধরপাকড় হচ্ছে। গত জনুয়ারিতে তাই ব্রিটেন জানিয়ে দেয়, তারা হংকংয়ের কিছু মানুষকে তাদের দেশে বসবাসের অনুমতি দেবে। এছাড়া কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানে যেতে চান অনেকে।

২০২০ সালে তাইওয়ান সরকার হংকং থেকে আসা ১০ হাজার ৮১৩ জনকে রেসিডেন্স পারমিট এবং এক হাজার ৫৭৬ জনকে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেয়, যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। ২০২১ সালে এক হাজার ৬৮৫ জনকে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেয়া হয়। চলতি বছর প্রথম চার মাসে তাইওয়ান ৫৯৭ হংকংবাসীকে পারমানেন্ট রেসিডেন্স দিয়েছে।

ইপ ও ওংকে সহায়তা করেছে তাইওয়ানে অবস্থিত মেইন ল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের অধীন হংকং হিউম্যানিটারিয়ান এইড প্রজেক্ট। এ প্রকল্পের আওতায় হংকং ছাড়তে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ভিসাসহ অন্যান্য সহায়তা করা হয়। পর্যবেক্ষকরা জানান, তাইওয়ানের সরকার হংকংয়ের গণতন্ত্র আন্দোলনকারীদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আবার নির্বাচিত হন। তবে বিরোধী দল কুমিনটাংয়ের নেতা হুয়াং কেই-বো অভিযোগ করে বলেন, সরকার আন্দোলনকারীদের সহায়তা করছে না। একই কথা বলেন হংকং থেকে আসা অনেক ব্যক্তি। তারা জানান, তাদের সহায়তায় সাই প্রশাসনের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তারা আশ্রয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা করতে চান না। তারা আর কখনও হংকংয়ে ফিরে যেতে চান না।