Print Date & Time : 30 May 2020 Saturday 1:59 am

পরিচালনা পর্ষদকে পাত্তা দিচ্ছেন না যমুনা অয়েলের এমডি

প্রকাশ: মার্চ ২৪, ২০২০ সময়- ০১:০২ এএম

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের কোম্পানি যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের বোর্ড কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স প্রধানকে বাদ দিয়ে নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। যদিও এ পদ্যচুতি ও নতুন নিয়োগে নেওয়া হয়নি পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিড অ্যান্ড এক্সচেঞ্জসহ (বিএসইসি) সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়নি, যা করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জানা যায়, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০১৮ সালে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড বাস্তবায়ন করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি হয়। কিন্তু পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের কোম্পানি যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আনসারি গত ৩ ফেব্রুয়ারি পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি না নিয়ে আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ খসরু আজাদ পদ থেকে সরিয়ে দেন। মূলত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে তিনি এ দায়িত্ব থেকে বাদ পড়েন। তার পরিবর্তে একই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন প্রতিষ্ঠানটির জুনিয়র পদে থাকা সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) আরশাদ আজগর চৌধুরী। আর এ নিয়োগে নেওয়া হয়নি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসইসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো অবহিত করেননি, যা করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর বিএসইসি’র করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের সব বিধান বাধ্যতামূলকভাবে পরিপালন করতে হবে। কোনো বিধান পরিপালনে অস্বীকৃতি জানালে অথবা ব্যর্থ হলে অথবা এ বিধান লঙ্ঘন করলে তা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য বলে গণ্য করা হবে। এক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অ-তালিকাভুক্তকরণ অথবা শেয়ারের লেনদেন স্থগিতকরণসহ অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চিফ রেগুলেটরি অফিসার মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, এটা যমুনার অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবহিত করতে হবে। আর অবহিত না করলে তা অবশ্যই করপোরেট গভর্ন্যান্সের লঙ্ঘন। এজন্য কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে, অন্যথায় আইন ও বিধি অনুসারে শাস্তি পেতে হবে।

বিষয়টি স্বীকার করে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আনসারি বলেন, ‘এ ধরনের পরিবর্তন তো অনেক হচ্ছে। কিছুদিন আগে মেঘনাও করেছে। তখন তো আপনারা রিপোর্ট করেননি। যমুনার বেলায় কেন রিপোর্ট করছেন? আর আমি যা করেছি তা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্ষমতা বলে করেছি। এতে তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এছাড়া বিষয়টি আমি বোর্ডকে জানিয়েছি। আরও ভালো জানতে হলে আপনি কোম্পানির সচিবের সঙ্গে কথা বলেন।’

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কোম্পানির সচিব মাসুদুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভালো জানেন। তবে বিষয়টি সঠিক, যা করপোরেট গভর্ন্যান্সের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ নিয়োগের সময় আমি এমডি সাহেবকে বলেছিলাম। এ নিয়োগের ফলে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোর্ড লঙ্ঘন হবে। কিন্তু তিনি বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি। আর এ পদে তো একজন এজিএম নিয়োগ পেতে পারে না। হয়তো ডিজিএম অর্থ পদটি খালি ছিল, তাই এমডি সাহেব তাকে (আজাদ) নিয়োগ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়্যারম্যান ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামছুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে সাড়া দেননি। ফলে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালে দুই কোটি টাকা মূলধন নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় তেল কোম্পানি হিসেবে পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল লিমিটেড (পিএনওএল) নামক কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ অ্যাব্যানডেন্ড প্রোপার্টি (কনট্রোল, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডিস্পোজাল) আদেশ ১৯৭২ (পিও নং ১৬, ১৯৭২) বলে পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল লিমিটেডকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার। পরে সরকার  কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয় এবং এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল অয়েলস লিমিটেড। ১৯৭৩ সালে ১৩ জানুয়ারিতে এক সরকারি আদেশ বলে এর পুনঃনামকরণ করা হয় যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল)। ২০০৮ সালে  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন মালিকানাধীন এ কোম্পানিটি শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত হয়। 

সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, যমুনা অয়েল লিমিটেড অকটেন, পেট্রোল, কোরোসিন, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, জেবিও, লুব অ্যান্ড গ্রিজ অয়েল, এলপিজি, বিটুমিন প্রভৃতি বিক্রয় করে। প্রতিষ্ঠানটির গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর মোট জ্বালানি বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩৯ মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছর বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫৯ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি পণ্যের বিক্রয় কমেছে ৮৭ হাজার ৩২০ টন।

অন্যদিকে যমুনা অয়েল গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পরিচালন মুনাফা করেছিল ৫২ কোটি টাকা। আর নিট মুনাফা করে ২৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংক জমার আয় ছিল ২৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংস্থাটির মুনাফার শতভাগ সাপোর্ট আসে ব্যাংক সুদ থেকে।