প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে কুটিরশিল্প

রিয়াজুল হক: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনও গুটিকয়েক ব্যক্তির আর্থিক সমৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই মজবুত হবে, যখন ব্যক্তিপর্যায়ে আর্থিক সমৃদ্ধি আসবে। গ্রামের অনেক পরিবারে এখনও আর্থিক অসচ্ছলতা বিদ্যমান। এ সমস্যা সমাধানে কুটিরশিল্প হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি খাত। কুটিরশিল্প পরিবারকেন্দ্রিক স্বল্পপুঁজির ব্যবসা। আমাদের দেশে কুটিরশিল্পের ইতিহাস অনেক পুরোনো এবং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প।

riazul

কুটিরশিল্প বলতে পরিবারের প্রাধান্যভুক্ত সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতীত স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ১০ লাখ টাকার নিচে এবং যা পারিবারিক সদস্যসহ অন্যান্য সদস্য সমন্বয়ে গঠিত ও সর্বোচ্চ জনবল ১৫-এর অধিক নয়। তথ্যমতে, কুটিরশিল্পের শ্রেণীকরণ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আট শ্রেণিভুক্ত। এগুলো হলো ক) খাদ্য, পানীয়, তামাক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প: দুগ্ধজাত, ফল প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, বেকারি, গুড় তৈরি, পশুখাদ্য, মুরগির খাদ্য, লবণ তৈরি, মিষ্টান্ন, মধু প্রক্রিয়াকরণ, বিড়ি, হুক্কা, তামাক, জর্দা, হাঁস-মুরগি পালন, চিড়া-মুড়ি তৈরি ইত্যাদি। খ) বস্ত্র ও চামড়াশিল্প: সুতা কাটা, হস্তচালিত তাঁত, বস্ত্র মুদ্রণ, জামদানি, সুচিকর্ম, নারিকেলের ছোবড়াজাত দ্রব্য, পাটের সুতা, চামড়াজাত দ্রব্য, বাটিক, শতরঞ্চি, কার্পেট ইত্যাদি। গ) কাঠজাত শিল্প: খেলনা, কাঠের আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশজাত দ্রব্যাদি, বাদ্যযন্ত্র, মাদুর শিল্প, কাঠ খোদাই, কাঠের কৃষি সরঞ্জামাদি, ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি এবং কাঠের উপজাত ইত্যাদি। ঘ) মুদ্রণ ও মোড়কসহ কাগজশিল্প: পুরোনো কাগজজাত দ্রব্য, মুদ্রণালয়, বই বাঁধাই, কাগজের ফুল ইত্যাদি। ঙ) রাসায়নিক, পেট্রোলিয়াম ও রসায়নজাত শিল্প: ছাপা ও রঞ্জনশিল্প, রঙ, আগরবাতি, প্রসাধনসামগ্রী, বুটপলিশ, মোম তৈরি, চিরুনি ও বোতাম, চক তৈরি, শ্লেট-পেনসিল, প্লাস্টিকের খেলনা, ফুল, ব্যাগ ইত্যাদি। চ) অধাতব খনিজশিল্প: চুনাপাথর ও শামুকজাত চুন, রঙিন চক, খড়িমাটি, চুড়ি ইত্যাদি। ছ) মেশিনারি ও যন্ত্রপাতিসহ ধাতবশিল্প: লৌহজাত আসবাবপত্র, তারকাঁটা, কাঁসা ও পিতল, স্টিল ট্যাংক, মেশিনারি সামগ্রী, কৃষি যন্ত্রপাতি, চুলের ক্লিপ, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি। জ) হস্তশিল্পসহ অন্যান্য শিল্প। আজ অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে আমাদের ঐতিহ্যের তালিকা থেকে। একসময় এই বাংলায় উৎপাদন হতো বিশ্বখ্যাত মসলিন। মসলিন হারিয়ে গেছে, জামদানি এখনও রয়েছে। জামদানি আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক। ইতোমধ্যে জামদানি বয়নের অতুলনীয় পদ্ধতি ইউনেস্কো কর্তৃক একটি অনন্যসাধারণ ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে কুটিরশিল্প অন্তর্ভুক্ত। কুটিরশিল্প খাতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা যাবে এবং সর্বোচ্চ সীমা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত হবে। ঋণের সুদহারও হবে অনেক কম। প্রতিটি ব্যাংক এসএমই হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে ঋণসংক্রান্ত যাবতীয় সেবা প্রদান করবে। এছাড়া কুটিরশিল্পসহ এসএমইর অন্যান্য খাত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের শিল্পোন্নয়নকে সংগঠিত করে অধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে আসছে। বাংলাদেশের মানচিত্রে সদ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়া ১১১টি ছিটমহলের বাসিন্দাকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সংযুক্ত করা এবং তাদের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বিকশিত করতে বিদ্যমান এসএমই নীতিমালার আলোকে এ অঞ্চলের কুটিরশিল্প, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের গ্রুপভিত্তিক এসএমই ঋণ বিতরণের আওতাভুক্ত করার বিষয়ে এসএমই-সংক্রান্ত নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে উল্লেখ আছে, ‘নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিককরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার, দেশের অর্থনীতিতে কুটিরশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিসিকের তথ্যমতে, ১৯৬১ সালে দেশে কুটিরশিল্পের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার। ১৯৯১ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় তিন লাখ ৪৭ হাজারে এসে দাঁড়ায়। ওই সময় কুটিরশিল্পে কর্মসংস্থান ছিল যথাক্রমে সাত লাখ ৭৩ হাজার এবং ১৩ লাখ ৩১ হাজারেরও বেশি। ১৯৬১ সালে প্রতিটি কুটিরশিল্পে গড়ে স্থায়ী বিনিয়োগ ছিল ৮০১ টাকা এবং ১৯৯১ সালে প্রতিটি শিল্পে গড়ে স্থায়ী বিনিয়োগ ছিল ১৪ হাজার ৩৩ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগে এবং বিসিক ও ব্যাংকগুলো কর্তৃক অর্থায়নের মাধ্যমে কুটিরশিল্পে ১৬ হাজার ৯৮৬ জনের কর্মসংস্থান হয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৫-এর তথ্যমতে, দেশে ক্ষুদ্র শিল্পের সংখ্যা এক লাখ ১৭ হাজার ৬৬৫টি এবং কুটিরশিল্পের সংখ্যা ছয় লাখ ৫৩ হাজার ৭৬৯টি। এ খাতে নিয়োজিত মোট জনবল ৩৭ হাজার একজন। জিডিপিতে ক্ষুদ্র ‍ও কুটিরশিল্পের অবদান ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। তথ্যমতে, কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠানের ৯৬ শতাংশ একক ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং তিন শতাংশ অংশীদারিমূলক। কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩৫ শতাংশ রেজিস্টারভুক্ত এবং ৬৫ শতাংশ রেজিস্টারভুক্ত নয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করা গেলে মোট উৎপাদন আরও বাড়বে।

mahali120140904161332

 

কুটিরশিল্পের উন্নয়ন গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। ইউনিয়ন পরিষদে কুটিরশিল্প ও সমবায়বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি রয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে যে কেউ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ ও অন্যান্য সেবা পেতে পারেন। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী প্রথম তফসিলের ৩০ নং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গ্রামীণ শিল্পের উন্নয়নে কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। কুটির বা লোকশিল্পী জনগোষ্ঠীকে কুটিরশিল্প স্থাপনে উদ্যোগী করে তোলে এবং সমবায় গঠনে উৎসাহিত করে থাকে। বিসিক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিতে জনসাধারণকে উৎসাহিত ও সহায়তা করে থাকে।

জাতীয় স্বার্থেই সংস্কৃতির ধারক হিসেবে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার প্রতিটি দেশে কুটিরশিল্পকে সংরক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও আমাদের কুটিরশিল্পের যেমন স্থানীয় পর্যায়ে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর চাহিদা অনেক বেশি। জনবহুল ছোট এ দেশটির জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর প্রয়োজন। আর্থিকভাবে আমাদের দেশের প্রতিটি কর্মক্ষম ব্যক্তি তথা পরিবার স্বাবলম্বী না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের চাকরির বাজারে শতভাগ চাকরির সুযোগ নেই। প্রয়োজন ও শখের তাগিদে বেত, বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র, সুতা ও কাপড়ের তৈরি সামগ্রী নানা রকমের শিল্পকর্ম ইত্যাদি যে কুটিরশিল্পের আঁতুড়ঘর, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রয়োজন শখের এ কাজগুলোকে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়া। এক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে এবং কুটিরশিল্পীদের বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে শিল্পকর্মগুলোর চাহিদা বাড়বে। শিল্পীরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে করে জাতীয় উন্নয়ন ঘটবে, প্রবৃদ্ধি হবে অর্থনৈতিক সূচকের। কুটিরশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পরিবার দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করে পরিবারের আর্থিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটাতে পারবে।

লেখক: উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]