প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন নিহত সেনাসদস্য শরিফ

প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে আফ্রিকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে টহলরত গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন সিরাজগঞ্জের বেলকুচির সৈনিক শরীফ হোসেন (২৬)। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন শরীফ। নিহতের খবর শুনে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

কথা ছিল মিশন থেকে ফিরে ছোট বোনকে বিয়ে দেবেন। কিন্তু সে আশা তার আর পূরণ হলো না। নিহতের খবর পেয়ে স্তব্ধ শরীফের পরিবার। কাঁদতে কাঁদতে যেন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তার বাবা-মা, ভাইবোন ও স্ত্রীসহ স্বজনদের। এখন তারা শরীফের লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মিশনে নিহত শরীফ হোসেনের বাড়ি উপজেলা সদরের বেড়াখাড়ুয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের লেবু তালুকদারের ছেলে। মা-বাবা, দুই ভাই, এক বোন ও স্ত্রীসহ পাঁচজনের সংসার শরীফের।

আজ বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর) সকালে নিহত শরীফের ছোট ভাই কাউসার তালুকদার এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে গত মঙ্গলবার মোবাইলের মাধ্যমে শরীফের মৃত্যুর খবর পরিবারকে জানানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছেলের মৃত্যুতে শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন তার মা পাঞ্জু আরা বেগম। কথা বলার ভাষা নেই বাবা লেবু শেখের। কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ভাই, বোন ও স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন শরীফের বাবা-মা। মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেছেন, তোমরা শুধু আমার ছেলেকে এনে দাও। এ বয়সে ছেলে এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে কোনো দিন ভাবিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অন্যের বাড়িতে সুতার কারিগর হিসেবে কাজ করে এবং দর্জির কাজ করে শরীফকে বড় করেছিলেন তার মা। বাবা ছিলেন তাঁতশ্রমিক। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন শরীফ। মিশনে যাওয়ার ৬ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে শরীফ সবার বড়। পরিবারে চলছে বোনের বিয়ে কথা। কথা ছিল মিশন থেকে ফিরে একমাত্র ছোট বোন লাকী খাতুনের বিয়ে দেবেন। কিন্তু মৃত্যুর খবর শুনে শোকে পরিবারটি এখন স্তব্ধ।

শরীফ হোসেনের ছোট ভাই কাউসার তালুকদার বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আমার ভাই নিহত হয়েছেন, এ খবর মঙ্গলবার রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে আমাদের জানানো হয়। খবরটা শুনে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সবাই কান্নাকাটি করছে। আমার ভাই আমাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। আমার বোনের বিয়ের কথা চলছে। ভাই বলেছেন, বোনের বিয়ে দিতে যত টাকা লাগে আমি দেব। পরিবারের কারো চিন্তা করার দরকার নেই। আমি মিশন থেকে ফিরে বিয়ে দেব। সেই ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। এখন আমাদের কী হবে।

নিহত শরীফ হোসেনের বাবা লেবু শেখ তালুকদার বলেন, আমি তাঁতশ্রমিকের কাজ করতাম। আমার স্ত্রী অন্যের বাড়ি থেকে সুতার কাজ করতেন। ছেলের চাকরি হওয়ার পর থেকে আমাদের কোনো কাজ করতে দিত না। ছেলেই সংসার চালাত। তার চাকরির টাকা দিয়ে সংসারের সব খরচ চলছিল। মিশনে যাওয়ার ছয় মাস আগে ছেলেকে বিয়ে করাই। এখন আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। এত অল্প বয়সে ছেলে এভাবে চলে যাবে কোনোদিন ভাবিনি।

বেলকুচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সাজেদুল বলেন, শরীফ নিহত হওয়ার খবর শুনে আমি তাদের পরিবারের খোঁজ খবর নেই। শরীফ অত্যন্ত ভালো একটি পরিবারের ছেলে ছিল। সে আমাদের বেলকুচির গর্ব।

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনিছুর রহমান বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে শরীফের মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। মৃত্যুর খবর পেয়ে নিহত শরীফের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারকে স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি শোকে স্তব্ধ। লাশ দেশে আনাসহ সব বিষয়ে নিহতের পরিবারকে সহযোগিতা করা হবে।

প্রসঙ্গত, গত ৩ অক্টোবর রাত ৮টার পর মধ্য আফ্রিকায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সময় ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) বিস্ফোরণে শরীফ হোসেনসহ তিন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। নিহত শান্তিরক্ষীরা হলেন সৈনিক শরিফ হোসেন (২৬), সৈনিক জসিম উদ্দিন (৩১) ও সৈনিক জাহাঙ্গীর আলম (২৬)।