মত-বিশ্লেষণ

পরিবারের বৈরিতায় কেন নষ্ট হবে নারীর সৃজনশীলতা?

ম. জাভেদ ইকবাল: খুব ভালো গান গায় রুনু। ছোটবেলায় ভালো ওস্তাদের কাছে তার হাতেখড়ি। স্কুল পেরিয়ে কলেজ সবখানেই তার গানের কদর ছিল। খুলনা বেতারের নিয়মিত শিল্পী হতে সময় লাগেনি। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাকে হাতছানি দিত। রুনু স্বপ্ন দেখত, গানের ভুবনে সাফল্যের পাখিকে ডানা মেলে উড়তে। সিহাব ভালোবাসে রুনুকে, রূপের চেয়েও শিল্পীমন সিহাবকে আকর্ষণ করে অনেক বেশি। ব্যবসায়ী সিহাবের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের কিছুদিন পরই পাল্টে যায় ভালো মানুষ সিহাবের আসল চেহারা। পরিবারের বিভিন্ন অজুহাত সে তুলে ধরে রুনুর সামনে। সিহাব তাকে বলে, তাদের পরিবারে গান গাওয়াটাকে কেউ ভালো চোখে দেখে না এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মন্দ কথা শুনতে হয়। সংসারকে আপন করতে গান ছেড়ে দেয় রুনু। কিন্তু ঘটনা এখানেই থেমে থাকে না। পরপর দুটো কন্যাশিশুর মা হওয়ার পর শুরু হয় অন্য নির্যাতন। পুত্রসন্তান জš§ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শাশুড়িসহ আত্মীয়দের কটু কথা হজম করতে হয় অহরহ রুনুকে। এমনি করে অনেক নারীর সৃজনশীল প্রতিভা নষ্ট হয়ে যায় পরিবারের বৈরী আচরণে।

বিলকিসের বিয়ের পর সুখেই কাটছিল তার দিনগুলো। সংসারে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদসহ সদস্যসংখ্যা আট। স্বামী ভিটেবাড়িতে শাকসবজি চাষের পাশাপাশি নিজে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালায়। সংসার বড় হওয়ায় বিলকিসের কাজ যেন শেষ হতে চায় না। তব্ওু হাসিমুখে সব কাজ করে যায়। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি তার কাজে সন্তুষ্ট হতে পারে না। এজন্য প্রায়ই তাকে কটু কথা শুনতে হয়। ঘটনা এখানে শেষ হয় না। বিলকিসের স্বামী বাড়ি ফিরলে তার কাছে বিলকিসের নামে মিথ্যা অভিযোগ বানিয়ে নালিশ করে শাশুড়ি। এজন্য তার স্বামী তাকে মাঝেমধ্যে মারধর করে। সংসার টিকিয়ে রাখতে বিলকিস মুখ বুজে সব সহ্য করে। এ রকম হাজারো মনগড়া সমস্যা একজন নারী প্রতিনিয়ত মেনে নিচ্ছে। এটা এক ধরনের পারিবারিক সহিংসতা। পরিবারে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা কোনো নারী নিজেও মেনে নেয় আমাদের সমাজের ধারাবাহিক কিছু নিয়মের কারণে। এটা যে নির্যাতন তাও সে জানে না, অথবা বুঝলেও মেনে নেয় বুঝে-না বুঝে।

নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে প্রতিদিনই। নারীদের ওপর সহিংসতা কমছে না, বরং উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। একের পর এক সহিংসতায় নারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। পরিবারিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে নারীদের সব ক্ষেত্রেই নানাভাবে সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে। নারীদের দেখা হচ্ছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। একটি মানবশিশু জন্ম গ্রহণের পর থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়। পরিবারের পুরুষ শিশুটি যে সুবিধা পায়, নারী শিশুটি তা পায় না। সংসারে অবহেলিত থাকে তারা। একাধিক সন্তান থাকে যেসব পরিবারে, সেখানে পুরুষ শিশুটি বিশেষ যতেœ বেড়ে ওঠে, সব সময় ভালোভালো খাবার দেওয়া হয় তাকে। নারী শিশুর ক্ষেত্রে উদাসীন থাকা হয়। পুরুষরা প্রাধান্য পায় বেশি। সন্তানের ব্যাপারে গর্ভবতী মায়ের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুরুষের সিদ্ধান্ত। পরিবার থেকে নারীরাও নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করে না। যদি কোনো নারী পুত্রসন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার ওপর নানাভাবে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন চালানো হয়। প্রযুক্তির উন্নতি যেমন জানার ক্ষেত্রকে উম্মোচিত করেছে, উন্নত প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক সমস্যা সমাধানের জন্য যেমন সহায়ক ভূমিকা রাখছে, তেমনি সাইবার অপরাধও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে অপরাধমূলক অভিপ্রায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই। সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে নারীরা। নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে ও আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নারী নির্যাতনের নতুন নতুন ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে আড়াল করে তুলছে।

নারীর প্রতি সহিংসতাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি বড় ধরনের অপরাধ। নারীর প্রতি সহিংসতার খুব লম্বা ইতিহাস রয়েছে, যদিও এ রকম সহিংসতার মাত্রা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ছিল, এমনকি আজও বিভিন্ন সমাজে এগুলোর মাত্রা ও ঘটনার ধরন বিভিন্ন হয়। প্রায়ই নারীকে সমাজে বা আন্তঃব্যক্তি সম্পর্কে অধীনস্থ করার কৌশল হিসেবে এ রকম সহিংসতা চালানো হয়। ব্যক্তি তার অধিকারপ্রাপ্তির বোধ, উচ্চস্থানের বোধ, নারীবিদ্বেষ, বা নিজের সহিংস প্রকৃতির জন্য নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করে।

দেশে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ নামে একটি আইন রয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে পরিবারের কোনো সদস্যের দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছে বা সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে আছে, এমন নারী ও শিশুরা প্রতিকারের জন্য শিশু ও মহিলাবিষয়ক দপ্তরে আবেদন করতে পারে। আইনটিতে শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন এবং আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি পারিবারিক সহিংসতার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বা সরকার-নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে আদালতকে সহযোগিতা করবেন, প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন এবং থানায় ঘটনা জানাবেন। এছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করাসহ অন্যান্য সহযোগিতা দেবেন।

আইনে বলা হয়েছে, মামলার প্রতিপক্ষ সুরক্ষা আদেশের শর্ত না মানলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে তিনি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। মিথ্যা আবেদনকারীর জন্য অনধিক এক বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার চালু হয়েছে। এখানে নির্যাতিত নারী একজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিনা মূল্যে আইনি সহায়তাসহ মনঃসামাজিক কাউন্সেলিংও পেয়ে থাকে।

সরকারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সমাজের অভিভাবকদের প্রতিরোধ আন্দোলনে শামিল হতে হবে। নারী নির্যাতনবিরোধী যেসব আইন আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো প্রয়োজন। এর আগে উচিত হবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা। আদালতের আদেশ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানে নারী নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে তা কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় নেতাদের সচেতনতা সৃষ্টির গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগ কিংবা প্রতিবাদ দিয়েই নারীর অবমাননা বা নারীর প্রতি নির্যাতন-সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না। সহিংসতা বন্ধ নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে, নারী-পুরষের বৈষম্য দূর করে সম-অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মানুষ ভাবার শিক্ষা এবং নারীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বপ্রথম পারিবারিক পরিমণ্ডলেই নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ক্রমবর্ধমান সামাজিক অবক্ষয় ও সহিংসতা আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্জনকে অর্থহীন করে দেবে।

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে পরিবারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কারণ পরিবারেই নারী সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। সমাজে এমন এক সচেতনতার বিকাশ প্রয়োজন যাতে দায়িত্ব ও কর্তব্যের আহ্বানে নারীর প্রতি সুন্দর ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে পুরুষ। নারীর যেমন প্রতিপক্ষ নয় পুরুষ, তেমনি নারীও পুরুষের প্রতিপক্ষ নয়; বরং নারী ও পুরুষ মিলেই সমাজ। এ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির লালন ও নৈতিকতার বিকাশের মধ্যেই লালিত রয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধের মূলমন্ত্র।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..