মত-বিশ্লেষণ

পরিবারের সযত্ন পরিচর্যায় বেড়ে উঠুক প্রজন্ম

বস্তায় থাকা একটি পচা আম ভালো আমগুলো পচানোর জন্য যথেষ্ট। একটি পরিবারের আদুরে সন্তান যদি বখাটে হয়, তবে সে তার পরিবার ও সমাজ ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। সমাজের চিত্র আজ বড় করুণ। প্রায় প্রতি ঘরেই কোনো সন্তানের জন্য মা-বাবার হাহাকার শোনা যায়। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ভাইদের এক সহোদর মাদকাসক্ত, বখাটে। শিক্ষক বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে মদের নেশায় বিভোর, বেপরোয়া। মৌলভী সাহেবের বড় ছেলে ইভটিজার। আপনার আমার ভাই সন্ধ্যার পর বাইরে আড্ডা দেয়। প্রতিবেশীর ছেলে রাত জেগে অনলাইনে গেম খেলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারে বখাটের জন্ম হচ্ছে। এটি সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাড়ি, পাড়া, মহল্লা, গ্রাম তথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

মনে রাখতে হবে, মায়ের গর্ভ থেকে বখাটে সন্তানের জন্ম হয় না; বরং তার মতো কোনো একজনের কাছে সে এহেন কুশিক্ষা পেয়েছে। কথায় আছে, সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। অর্থাৎ অসৎসঙ্গে সর্বনাশ হয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এটি মোট শিক্ষার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। উচ্চ পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার আরও বেশি। বখাটেদের বেশিরভাগই হয়ে থাকে কলেজছাত্র, অথবা এসব ঝরে পড়া উঠতি বয়সি যুবক কিংবা মাদকাসক্ত। তাদের সাধারণ কাজ সন্ধ্যার পর আড্ডা দেওয়া, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালনা, ধর্ষণ, আপত্তিকর ভিডিও বা ছবি অপপ্রচার, বাবা-মায়ের অবাধ্যতা এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মেয়ে বখাটেদের সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া কিছু মেয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের বিগড়ে যাওয়ার জন্য একটি মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। একবার মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তাকে আবার স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনা কঠিন। সমাজে বখাটে জন্মালে আমরা আফসোস করি, তিরস্কার করি, অবহেলা করি; নিয়তি বলে সান্ত¡না নিই। কিন্তু সমাজ ধ্বংসের কারণ নিবারণ করতে পারি না।

কিছু ছোট কারণে সমাজে বখাটের জন্ম হয়। যেমন স্কুল পালানো, দেরিতে স্কুলে যাওয়া ও আসা, বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়া শিশু, বড়দের সঙ্গে তর্ক, বাবার পকেট মারা, মিথ্যা কথা বলা, অযথা বাইরে খাওয়া, সন্ধ্যার পরও বাইরে থাকা, নানা অজুহাতে বন্ধুর বাড়ি রাতযাপন, রাত জেগে মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার, আপত্তিকর ভিডিও দেখা, নিজের কোনো তথ্য পরিবার-পরিজনকে না জানানো, পরীক্ষায় ফল খারাপ করা, প্রেমে বিচ্ছেদ, হতাশা ও বিষন্নতায় ভোগা প্রভৃতি। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণ থাকা সত্ত্বেও সে বখাটে নাও হতে পারে।

পরিবারের প্রশ্রয়েই যেহেতু কুসন্তান হয়ে ওঠার সূত্রপাত, তাই শিশুকাল থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। উঠতি বয়সে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজসাধ্য নয়, তথাপি সন্তানদের মেলামেশার ব্যাপারে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের বিষয়ে আরও সচেতন থাকতে হবে। পরিবারে অনুশাসন, নীতি ও নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। সন্তানকে গুণগত সময় (quality time)  দিতে হবে। পরিবারেই বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের স্নেহ অনুশীলন করা গেলে সুফল আসবেই। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের পারস্পরিক সমন্বয় ও সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুল-কলেজ থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিন। শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া রোধে সরকারি পদক্ষেপের দিকে চেয়ে না থেকে নিজ অবস্থানে ব্যক্তিকেও ভূমিকা রাখতে হবে।

সন্তানকে সুসন্তান করতে না পারায় অনেক মা-বাবা হতাশ। মনের কষ্ট চেপে বলতে না পারা কথা ও গোপন কান্নার ইতি চাই। আর্তনাদ ও কষ্টের অবসান চাই। শিক্ষকের মনঃকষ্ট ও বেদনার সমাধান চাই। সতেজ ও সজীবতায় ভরা পরিবেশ চাই। মমতা আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়া সুশীল সমাজ চাই। আমরা মাদকাসক্ত ও বখাটে সন্তান চাই না। বখাটেমুক্ত সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। প্রিয় সন্তানদের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এ পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য করে যাই।

নাঈমা ফেরদৌস

প্রভাষক, জুরানপুর আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

দাউদকান্দি, কুমিল্লা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..