সম্পাদকীয়

পরিবেশবান্ধব উপায়ে জাহাজ ভাঙা হোক

স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বাংলাদেশের সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা ও সুযোগ তৈরি হবে, তেমনই নতুন চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। তখন রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে প্রধান রপ্তানিপণ্যে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের রপ্তানিপণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে, নতুন বাজার ধরতে হবে, বিদ্যমান পণ্যকে আকর্ষণীয় করতে এ ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। যেসব দেশ শিল্পে পরিবেশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে, শ্রমিকদের সুরক্ষা দেবে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেÑক্রেতারা ওই দেশগুলো থেকেই পণ্য কিনবে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে রপ্তানিতে শুল্ক সংযোজনের পাশাপাশি দেশের শিল্প কারখানায় শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগও স্বচ্ছতা দাবি করবেন আমদানিকারকরা। ‘করোনার মাঝেও জাহাজ ভাঙায় শীর্ষস্থান ধরে রাখল বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।  

খবরে বলা হয়, করোনার কারণে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এলেও গত বছর জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে চাঙাভাব। আর গত কয়েক বছরের মতো ২০২০ সালেও এ শিল্পে দাপট অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ।

মুক্ত বাণিজ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্যকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এটিই আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান সমস্যা। মাত্র চার-পাঁচটি রপ্তানি পণ্য মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশ দখল করে আছে। কোন দেশ কীভাবে পণ্যে বৈচিত্র্য এনেছে, তা বিবেচনা করলে দেখা যায় শ্রমিদের সুরক্ষায় যারা ব্যবস্থা নিয়েছে, তারাই এগিয়ে যাচ্ছে।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় উদাসীনতা। এর মূল কারণ, শিল্প মালিকরা চান কম বিনিয়োগে বেশি মুনাফা। মালিকরা টাকার পাহাড় গড়লেও শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো বিষয় মালিকপক্ষের কাছে কখনোই গুরুত্ব পায়নি। জাহাজ কাটার আগে বর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস ও বিস্ফোরকমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসৃত হয় না। প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছেন। এখানে শ্রমিকদের প্রাণহানি, পঙ্গুত্ববরণ ও ক্ষতিপূরণ না দেয়ার দৃষ্টান্ত অনেক। বছরের পর বছর জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা এবং শ্রমিকের মৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তেমন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো সুবিধাও জাহাজ ভাঙা শ্রমিকরা পাচ্ছেন না। শ্রমিকরা ‘কাজ নেই মজুরি নেই’ ভিত্তিতে কাজ করেন। ফলে সবেতন ছুটির প্রচলন নেই। অস্থায়ী ভিত্তিতে ঠিকাদারের অধীনে কাজ করে বিধায় শ্রমিকরা আহত বা নিহত হলে অনেক নিয়োগকর্তা শ্রমিকদের দায় নেন না। এমনকি শ্রমিকদের ন্যূনতম ব্যক্তিগত আত্মরক্ষামূলক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকরা বছরের পর বছর কাজ করে চলেছেন। রাতের বেলায় ইয়ার্ডে কাজ না করার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও মালিকরা তাও মানছেন না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এত বঞ্চনার পরও কর্মজীবী এ শ্রমিকদের অবদানেই জাহাজ ভাঙা শিল্প এখন মজবুত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। করোনাকালেও  এ শিল্প দাপট ধরে রেখেছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে এ খাতকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। বিষাক্ত বর্জ্যবাহী জাহাজ কাটা বন্ধে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অনুমোদন নিয়ে এবং ছাড়পত্র নিয়েই যেন জাহাজ কাটা হয়। অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিকদের প্রতি অবহেলার কারণে এ শিল্পে যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..