প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত টেকসই নগর

 

নিতাই চন্দ্র রায়: অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারখানা নির্মাণের ফলে আমরা প্রতিদিন ধ্বংস করছি রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের বনভূমি, গাছপালা আর সবুজ আচ্ছাদন। ভরাট করছি জলাশয়। নষ্ট করছি জীববৈচিত্র্য। কলকারখানা, ইটভাটা ও যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, গৃহস্থালি এবং শিল্পকারখানার কঠিন ও তরল বর্জ্য ঢাকার পরিবেশকে মারাত্মক দূষিত করে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে নগরবাসী আক্রান্ত হচ্ছে নানারকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে। বাতাসে ভাসমান অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা সর্বোচ্চ ২.৫ পিএম থাকা উচিত হলেও ঢাকার বাতাসে এর উপস্থিতি রয়েছে কয়েকগুণ বেশি। এ কারণে শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, অবসাদ, ফুসফুসে প্রদাহ, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু বায়ুদূষণই নয়, শব্দদূষণও রাজধানীর এক বড় সমস্যা। দূষণমাত্রার চেয়ে ঢাকায় দেড় থেকে দুইগুণ বেশি শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। গাড়ির হর্ন, মাইকিং, গানবাজনা, অ্যাম্বুলেন্স ও নির্মাণকাজের শব্দে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। রাজধানীতে শব্দদূষণের কারণে বধির রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এছাড়া যানজট, জলাবদ্ধতা, ময়লা-আবর্জনা, সুপেয় পানি, বাসস্থান, স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব এবং খোলা জায়গা, পার্ক, খেলার মাঠ ও চিত্তবিনোদনের অপর্যাপ্ততা নগরবাসীর জীবনকে করে তুলেছে যন্ত্রণাময় আর দুর্বিষহ।

‘বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা’ শীর্ষক ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকা শহরের সে চিত্রই উঠে এসেছে আবার। বসবাসের সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭। অর্থাৎ বসবাসের সবচেয়ে অনুপযোগী চতুর্থ শহর হলো ঢাকা। গত বছর এ তালিকায় ঢাকা ছিল দ্বিতীয় শীর্ষ বসবাসের অনুপযোগী শহর এবং ২০১৪ সালেও এর অবস্থান ছিল একই রকম। এবার বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসের অনুপযোগী শহর হচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি এবং তৃতীয় অবস্থানে নাইজেরিয়ার লেগোম। বসবাসের সবচেয়ে অনুপযোগী ১০ শহরের মধ্যে পাকিস্তানের করাচি হলো সপ্তম। আর ১০ শীর্ষস্থানীয় বসবাসযোগ্য শহরের মধ্যে প্রথমে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা ও কানাডার ভাংকুভার। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেছেন, ‘গত বছরের তুলনায় আমাদের অবস্থান সামান্য উন্নতি হয়েছে এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে এ নিয়ে আমরা তৃপ্ত নই। আমাদের প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি।’ প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করে বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা নির্ণয় করা হয়েছে, সেগুলো হলো: স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্য পরিসেবা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। বিবেচিত বিষয়গুলো নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবন যাপন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলোকে অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এগুলো শুধু একটি দেশের শহরের বাসযোগ্যতাকেই বোঝায় না, সারা দেশের সার্বিক সমৃদ্ধির প্রতিও ইঙ্গিত করে। আমাদের সৌভাগ্য জনসংখ্যা, যানজট, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে বিবেচনা করা হয়নি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে ঢাকার অবস্থান আরও অনেক নিচে নেমে যাবে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

জানা যায়, এশিয়ার অন্যতম পরিকল্পিত শহর হচ্ছে ভারতের চণ্ডীগড়। চণ্ডীগড় পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রাজধানী। সেই শহরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কনভেনশন সেন্টার গেটে হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা রয়েছে নগর সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধীর একটি বিখ্যাত বাণী, যার অর্থ হলো:‘নগর বলতে আমি শুধু ইট আর দালানকে বুঝি না, নগর আধুনিকতা আর প্রকৃতির যুগল বন্ধন, যেখানে মানুষ সুস্থভাবে, আনন্দের সঙ্গে বাস করবে সভ্যতা আর প্রকৃতির ক্রোড়ে’। শহরটি ঘুরে দেখলে মনে হবে গান্ধীজীর বাণী সত্যিই বাস্তবায়িত হয়েছে চণ্ডীগড়ে। চণ্ডীগড়ে কোনো বাঁকা রাস্তা নেই। সব বাড়ি দোতলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। চার লেনের প্রশস্ত রাস্তা। কেউ কাউকে ওভারটেক করে না। কোনো হর্নের বিকট শব্দ নেই। কিছুদূর পরপর খোলা মাঠ। অজস্র পার্ক। বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন গোলাপ বাগান। আরও আছে রক মিউজিয়াম, অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও অজস্র গাছপালার সমাহার। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমরাও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, সবুজ ও টেকসই নগরের কথাই বলছি বারবার। আমরা বলছি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে নগর ও নগরীয় কৃষির বাংলাদেশ। নগর পরিকল্পনায় কৃষিকে অন্তর্ভুক্ত করে নগরবাসীর প্রয়োজনীয় খাবার শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম নগর ও তার আশপাশেই উৎপাদন করতে হবে। সে সঙ্গে নগরের বাড়িঘরের ছাদে, রাস্তার দুই ধারে, সড়কদ্বীপে, অফিস-আদালতের অব্যবহৃত জায়গায়, জলাশয়ের ধারে, কবরস্থান ও শ্মশানের খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ রোপণ করে ঢাকাসহ দেশের সব নগরকে সবুজায়িত করতে হবে। যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে গ্রহণ করতে হবে সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পরিকল্পনা। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈবসার প্রস্তুতের ওপর গ্রহণ করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প। প্রতিটি শহরের আশপাশের নদীনালা, খালবিলগুলোকে করতে হবে দখল ও দূষণমুক্ত।

নবগঠিত ময়মনসিংহ বিভাগের উন্নয়ন পরিকল্পনা সংক্রান্ত সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কোনো একটা কিছু হলেই ঢাকায় আসতে হবে, এভাবে তো মানুষের সেবা নিশ্চিত করা যায় না। তাই তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর মানসিকতা বাদ দিয়ে দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আর ১৬ কোটি মানুষের সেবা পৌঁছে দিতে হলে ক্ষমতাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা একান্ত প্রয়োজন।’ আমাদের চিন্তাকে স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী করতে হবে। ভবিষ্যতে নগর সম্প্রসারণে জনসংখ্যা বাড়লেও অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যাতে বজায় থাকে সে বিষয়টি পরিকল্পনায় আনতে হবে। বৃষ্টির পানি এক বড় সম্পদ এবং এটি সবচেয়ে নিরাপদ। বছরে চার-পাঁচ মাস আমাদের দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়। যেখানে কোনো আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হবে, সেখানেই জলাধার তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু বর্তমান অবস্থাকে বিবেচনা করে নয়, আগামী ২০-৩০ বছরের অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ন করতে হবে। একটি নগরে আগামী ৩০ বছর পর কত জনসংখ্যা হবে, সেই জনসংখ্যার জন্য কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরকার, কতটি হাসপাতাল লাগবে, কী পরিমাণ রাস্তাঘাট, নর্দমা, খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, পার্ক ও বিপণিকেন্দ্রের প্রয়োজন হবে, কতগুলো যানবাহন চলাচল করবে সেসব বিবেচনায় নিয়েই প্রতিটি নগরে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ নগরে বসবাস করছে। যত দিন যাচ্ছে, নগরবাসীর সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা ও বেশি আয়ের আশায় এবং নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বাড়িঘর হারিয়ে সর্বস্বান্ত মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে শহরের বস্তিগুলোয়। এভাবে নগরের জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে দেশের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ সাড়ে আট কোটি লোক এবং ২০৫০ সালে দেশের শতভাগ লোক অর্থাৎ ২৭ কোটি লোক নগরে বসবাস করবে। তাই ২০৫০ সালের চাহিদা মাথায় রেখেই সারা দেশের নগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং সে অনুযায়ী সব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন থেকেই শুরু করতে হবে। এজন্য সরকারকে প্রতিটি নগরে এক ধরনের স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক নগর গঠন করতে হবে। কারণ নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ও টেকসই নগর গড়া কোনো অবস্থাতেই সম্ভব হবে না।