প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে বৃক্ষের অবদান

 

নিতাই চন্দ্র রায়: বৃক্ষ মানুষের পরম বন্ধু। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৃক্ষ আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। বৃক্ষ রোপণ, পরিচর্যা ও সংরক্ষণের বিষয়ে সাধারণকে সচেতন ও আগ্রহী করে তুলতে গত জুন মাসে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করা হয়। এবারের বৃক্ষরোপণ অভিযানের প্রতিপাদ্য ‘বৃক্ষরোপণ করে যে, সম্পদশালী হয় সে’।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গা, সড়ক-মহাসড়ক ও রেললাইনের দু’পাশ, চারণভূমি, বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশকে আরও সম্পদশালী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জীবন ও জীবিকার জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য। পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ, ভূমির ক্ষয়রোধ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনী ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে।

একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কমপক্ষে ২৫ শতাংশ জমিতে বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। অন্যদিকে জাপানে ৬৩, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬৫, মালয়েশিয়ায় ৬৩, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫, ফিলিপাইনে ৩৬, থাইল্যান্ডে ৪৮, নেপালে ২৩, শ্রীলঙ্কায় ৪৭ ও মিয়ানমারে ৬৭ শতাংশ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। বাংলাদেশে মাত্র ২৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি রয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমরা প্রতিবছর হারাচ্ছি দশমিক সাত শতাংশ হারে কৃষিজমি, উজাড় করছি বনভূমি ও ধ্বংস করছি বন্যপ্রাণীদের অভয়াশ্রম। এ-কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে দেশ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে দু’শতাধিক লোক মারা গেছে, বহু আহত ও শত শত বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। এর প্রধান কারণ বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ।

পৃথিবীতে যে হারে বন উজাড় হচ্ছে, সে হারে কিন্তু নতুনভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় কাটা হচ্ছে এক লাখ ৩০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছ; এর বিপরীতে লাগানো হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার চারা। এতেই বোঝা যায়, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি আমরা।

বৃক্ষ আমাদের ফল দেয়, ফুল দেয়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ দেয়, সুশীতল ছায়া দেয়, শিল্পের কাঁচামাল জোগায়, বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। বৃক্ষ যদি অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, বায়ুমণ্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ না করে, তবে পৃথিবীতে কোনো প্রাণী এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ জীবজগতের বাঁচা-মরা এই সবুজ বৃক্ষের ওপর নির্ভরশীল।

বৃক্ষরোপণ ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের সঙ্গে তুলনীয়। কারণ আজ একটি সেগুন, মেহগনি, কাঁঠাল, কড়ই গাছ রোপণ করলে ২০ বছর পর এর কাঠের দাম হবে কমপক্ষে দু-তিন লাখ টাকা। এভাবে কোনো ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করে অল্প সময়ে প্রচুর সম্পদের মালিক হতে পারে।

ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, একটি গাছ তার ৫০ বছরের জীবনে পৃথিবীর প্রাণিকুলকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের ফলে বায়ুদূষণ রোধ করে ১০ লাখ টাকার। বাতাসে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে বায়ুমণ্ডলকে ঠাণ্ডা রাখে পাঁচ লাখ টাকার, বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে পাঁচ লাখ টাকার, মাটির ক্ষয়রোধ করে উর্বরতা বাড়ায় পাঁচ লাখ টাকার, পাখি-প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দেয় পাঁচ লাখ টাকার আর ফল ও কাঠ দেয় পাঁচ লাখ টাকার। একটি ২৫০ মিটার চওড়া বন বাতাসে জমে থাকা সালফার-ডাই-অক্সাইডের প্রায় ৩৫ শতাংশ শুষে নিতে সক্ষম। একটি গাড়ি ২৫ হাজার কিলোমিটার পথ চলে যে বায়ুদূষণ করে, তার পুরোটাই অল্প সময়ে শুষে নিতে পারে একটি বড় গাছ। ক্যানসার নিরাময়ের জাদুকরী গুণ আছে পৃথিবীর প্রায় এক হাজার ৪০০ বৃক্ষপ্রজাতির। বনের নির্মল বাতাসের সংস্পর্শে অনেক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে পৃথিবীতে ৬২ বিলিয়ন ডলারের ভেষজ বৃক্ষের বাজার রয়েছে। এ বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে। অথচ এর প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভব।

ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টি, বজ পাত থেকে বৃক্ষ মানুষের জীবন রক্ষাসহ যে কত উপকার করেÑতা বলে শেষ করা যাবে না। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ রোপণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে ৬৯১ জনের মৃত্যু হয়। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর তাগিদে সরকার দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এটিকে সবচেয়ে কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসাদুল হকের মতে, বজ্র যেহেতু উঁচু জায়গায় আঘাত করে, সে হিসেবে তালগাছে আগে বজ্র পড়ে। ফলে লোকালয়ে মানুষের মৃত্যুসংখ্যা হ্রাস পায়। তালগাছ অনেক দিন বেঁচে থাকে। ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। মাটির ক্ষয়রোধ করে, ঝড়-বাতাস থেকে বাড়িঘর রক্ষা করে। তাই গ্রামীণ রাস্তার দু’ধারে ও বসতবাড়ির আশপাশে অন্যান্য ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের সঙ্গে তালগাছের চারা রোপণ করা উচিত। ঘর তৈরিতে তালকাঠ উত্তম। বন্যায় তালের নৌকা অনেক উপকারে লাগে। জ্বালানি হিসেবেও এর চাহিদা বেশ। স্ত্রী ও পুরুষজাতীয় তালগাছ ৯০ থেকে ১২০ দিন দৈনিক ১২ থেকে ১৫ কেজি রস দেয়। প্রতি পাঁচ কেজি রস থেকে এক কেজি উন্নতমানের গুড় তৈরি হয়। তালগাছ লবণাক্ত জমিতেও বেঁচে থাকে। তাই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও মাটির ক্ষয় রোধে ব্যাপকভিত্তিতে এটি লাগানো যেতে পারে।

তাল, সুপারি, নারিকেল, খেজুর গাছ ছাড়াও বাড়ির আশপাশ, বন-জঙ্গল ও রাস্তাঘাটের পাশে অযতœ-অবহেলায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন গাছ। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে সেগুলো কেটে তৈরি করছে কাঠ। ওই কাঠ বিক্রি করে প্রচুর অর্থও উপার্জন করছে। এ গাছ শুধু ব্যক্তির অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, জাতীয় অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করছে। চারা লাগানো থেকে শুরু করে পরিচর্যা, কাঠ কাটা, আসবাব তৈরিÑপ্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে। শখ করে রোপণ করা এ গাছই বছর শেষে জিডিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। জিডিপিতে গাছের অবদান নিয়ে সমীক্ষা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিবিএস) জাতীয় হিসাব শাখা। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, পরিবার পর্যায়ে অর্থাৎ বাড়ির আশপাশে যে গাছপালা লাগানো হয়, তা থেকে অর্থনীতিতে গড়ে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা যোগ হয়। বর্তমানে দেশের ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৮ পরিবার এভাবে গাছ লাগিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। প্রতিটি পরিবার কমপক্ষে পাঁচ শতক জায়গায় বিভিন্ন গাছ লাগায়। মূলত গাছ থেকে কাঠ, লাকড়ি ও রাবার তৈরি হয়। পরে তা বিক্রি করে অর্থোপার্জন করে পরিবারগুলো। আর উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত যে মূল্য সংযোজন হয়, তা-ই জিডিপিতে অবদান রাখে। বিবিএসের সমীক্ষায় আরও বলা হয়, গাছ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কাঠ উৎপন্ন হয়। এ কাঠের আর্থিক মূল্য প্রায় ছয় হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশে প্রতিবছর ১০ লাখ ৫৮ হাজার বাঁশ উৎপন্ন হয়। এ বাঁশের আর্থিক মূল্য দুই হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এছাড়া বছরে লাকড়ি হয় ৫১ লাখ ১১ হাজার ৮৩৫ টন, যার আনুমানিক মূল্য চার হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। আর রাবার উৎপন্ন হয় এক হাজার ৫৫২ টন। এর বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। গাছের অবদানের প্রকৃত চিত্র এত দিন গণনায় দেখানো হতো না। সমীক্ষাটির ফলে এখন থেকে প্রতিবছর গাছের অবদান হিসাব করা সম্ভব হবে। এতে জিডিপি কিছুটা হলেও বাড়বে এবং গাছের গুরুত্ব দেশবাসীসহ সংশ্লিষ্ট মহল ভিন্ন আঙ্গিকে অনুধাবন করতে পারবে।

 

সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লি.

netairoy18Ñyahoo.com