মত-বিশ্লেষণ

পরিমিত আহার ও কায়িক শ্রম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম

লিপিকা আফরোজ: খুব আয়েশ করে গরম গরম রসগোল্লা খাচ্ছিলেন লালন। পাশে বসে মিথুন সিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে দিতে লালনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দুজনই চাকরিজীবী। লালন সরকারি চাকুরে, আর মিথুন আছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। পাঁচ বন্ধু মিলে একটি রেস্টুরেন্টে বসেছেন বিকালের নাস্তা করতে। লালন টিপ্পনী কেটে আফসোসের সুরে বললেন, ‘আহারে বেচারা! মুখে রুচি, পকেটে টাকা আর দুর্বার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একটু মিষ্টিমুখ করার সাধ্য নেই। ভাই, আপনি না হয় রস চিপে একটি শুকনো রসগোল্লা খেয়ে নিন।’ লালনের কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসলেন মিথুনও। হাসি থামলে মিথুন বললেন, ‘খান খান, রসগোল্লা, চমচম সবই খান, যেদিন আমার মতো ইনসুলিন ঘাটতিতে পড়বেনÑসেদিন আপনিও আমার সঙ্গে সিঙ্গাড়া খাবেন, দাওয়াত দিয়ে রাখলাম অগ্রিম।’

এক সপ্তাহ পরের কথা। নিজের দপ্তরে কাজের ফাঁকে বসে ডিজিটাল গ্লুকোমিটারে নিজেই নিজের ডায়াবেটিক মাপছেন। কী একটা কাজে লালন এসেছেন। মিথুনের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। অনেক কষ্ট করে, ডায়েট কন্ট্রোল, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি করে তিনি ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। অনেকটা কৌতূহলবশত লালনের রক্ত পরীক্ষা করতে চাইলেন তিনি। লালনও আপত্তি করলেন না। রক্তে সুগারের পরিমাণ দেখে দুজনই একেবারে হতভম্ব! লালনের রক্তে সুগারের পরিমাণ ২২ মিলি মোল/লি, যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় তা সাতের নিচে থাকার কথা। তার ডায়াবেটিক মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে; কিন্তু তিনি কিছুই টের পাননি। লালনকে স্বাভাবিক রাখতে মিথুন বললেন, মনে হয় আমার যন্ত্রটা ঠিক নেই, আপনি একজন ডাক্তারের কাছে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করান।

লালনের মতো এ দেশের হাজারো মানুষ ডায়াবেটিকে আক্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রোগ শনাক্ত না হওয়ায় ধীরে ধীরে অকাল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ সঠিক সময়ে এ রোগ শনাক্ত করতে পারলে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা ও পরিচর্যায় এ রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হাজারো মানুষের।

ডায়াবেটিক বা বহুমূত্র হরমোনের ঘাটতিজনিত একটি রোগ। এটি ছোঁয়াচে নয়। সাধারণভাবে রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াকেই আমরা ডায়াবেটিস বলে ধরে নেই। রক্তে গ্লকোজের পরিমাণ বৃদ্ধির একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া রয়েছে। অগ্ন্যাশয় নিঃসৃত ইনসুলিন নামে হরমোনের ঘাটতি বা অনুপস্থিতির ফলে রক্তে গ্লুুকোজের/সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়, একেই বলে ডায়াবেটিক। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪১ কোটি লোক এ রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮৫ লাখেরও বেশি। এছাড়া প্রতিবছর দেশে নতুন যোগ হচ্ছে এক লাখের মতো রোগী। বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রতি সেকেন্ডে একজন করে মৃত্যুবরণ করছে।

শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানিÑএই ছয় ধরনের খাবারের মধ্যে শেষের তিনটি পরিপাকের প্রয়োজন হয় না। স্নেহ-জাতীয় খাবার পরিপাক শেষে বিভিন্ন ধরনের লিপিড ও গ্লিসারাইড তৈরি করে যা শরীরে আত্তীকৃত হয়। আমিষ হতে বিভিন্ন এমাইনো এসিড তৈরি হয়ে দেহে আত্তীকরণ ঘটে। পরিপাক শেষে শর্করা গ্লুকোজ বা সুক্রোজে রূপান্তরিত হয়। অপেক্ষাকৃত সরল আণবিক গঠনের গ্লুকোজ দেহে শোষিত হয়। শ্বসন প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ ভেঙে কার্বন ডাই অক্সাইড, পানি ও শক্তি উৎপাদন করে। গ্লুকোজের জারণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তিই মূলত মানুষ ও সব প্রাণী দেহের সব শক্তির জোগান দেয়। স্নেহ-জাতীয় খাবারও দেহে শক্তি জোগায়; তবে এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা একটু জটিল ও সময়সাপেক্ষ। মানব দেহে জরুরি প্রয়োজনে শক্তির জোগান দিয়ে থাকে গ্লুকোজ।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা-জাতীয় বস্তু পরিপাক হয়ে সরাসরি শ্বসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। শর্করা-জাতীয় খাবার পরিপাক শেষে বিশিষ্ট হয়ে অপেক্ষাকৃত সরল আণবিক গঠনবিশিষ্ট গ্লুকোজ অণু উৎপন্ন করে। এই গ্লুকোজ পাকস্থলীর ক্ষুদ্রান্তে শোষিত হয়ে রক্তরস দ্বারা বাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছায় এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে শক্তি উৎপাদন করে। বাড়তি গ্লুকোজের কয়েক হাজার অণু একত্রিত হয়ে গ্লাইকোজেন ও স্টার্চ নামের গ্লুকোজের পলিমার গঠন করে। গ্লাইকোজেন ও স্টার্চ লিভার/যকৃতে সঞ্চিত থাকে এবং দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় রক্তে প্রবেশ করে এবং বিপরীত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লুকোজে বিশিষ্ট হয়। এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে দেহকোষে প্রবেশ করে এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় শক্তি তৈরিতে অংশ নেয়। গ্লুকোজ হতে গ্লাইকোজেন বা স্টার্চ (গ্লুকোজের পলিমার) গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে অগ্ন্যাশয় নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন। যাদের অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিনের উৎপাদন হ্রাস পায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাদের রক্তের গ্লুকোজ হতে গ্লাইকোজেন বা স্টার্চ উৎপাদনও ব্যাহত হয় অথবা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাড়তি সুগার/গ্লুকোজ লিভারে সঞ্চিত না হয়ে রক্তেই থেকে যায়। ফলে রক্তরসে গ্লুকোজ/সুগারের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এ অবস্থাকেই বলা হয় ডায়াবেটিস।

প্রাথমিকভাবে ঘন ঘন প্রশ্রাবের বেগ হওয়া, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়া, গলা শুকিয়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন হ্রাস পাওয়া প্রভৃতি বাহ্যিক উপসর্গ দেখা যায়। কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে এসব লক্ষণের সবগুলো একত্রে নাও প্রকাশ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে দু’একটি লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা সুস্থ থাকতেও সবারই উচিত মাঝে মাঝে রক্তের সুগার লেভেল পরীক্ষা করা। কারণ, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ। এক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিসের কারণে দেহের অনেক ক্ষতি হতে পারে। বলা হয়ে থাকে, এ রোগ হাজারো রোগকে দেহে আমন্ত্রণ জানায়। ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি/বৃক্ক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, ধীরে ধীরে ওজন হ্রাস পায়, অবসাদগ্রস্ততা দেখা যায়। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়, উচ্চ রক্তচাপ/হাইপারটেনশন দেখা দেয়, দেহে কোনো কারণে ক্ষত/ঘা সৃষ্টি হলে সহজে শুকায় না এবং হƒদরোগ দেখা দেয়।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে সর্বপ্রথম খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ রোগে আক্রান্ত হলে রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এজন্য প্রথমেই দরকার কার্বোহাইড্রেট/শর্করা-জাতীয় খাবার, যেমন- মিষ্টিজাতীয় খাবার, ভাত, আলু, সুজি, রুটি প্রভৃতি পরিমাণমতো খেতে হবে। মিষ্টিজাতীয় খাবার একেবারেই পরিহার করা উচিত। পক্ষান্তরে বেশি করে শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। আঁশজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। তেল ও চর্বিজাতীয় খাবার, ফাস্টফুড ও কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন এ রোগের ক্ষতিকর প্রভাব হতে আমাদের রক্ষা করতে সক্ষম।

ডায়াবেটিস অনিরাময়যোগ্য কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। এ রোগে একবার আক্রান্ত হলে তা আর ভালো হয় না। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, সঠিক চিকিৎসা, পর্যাপ্ত কায়িক শ্রম ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রাখতে পারে সুস্থ এবং করতে পারে দীর্ঘায়ু। ডায়াবেটিসের সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কম শারীরিক পরিশ্রম, বড় ধরনের আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অবেসিটি বা স্থূলতা এবং বংশগত কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়Ñএ ধারণা নিতান্তই ভুল। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করা বাঞ্ছনীয়; কিন্তু মিষ্টিজাতীয় খাবার এ রোগের কারণ নয়।

সরকার ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসায় সর্বদা তৎপর রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডায়াবেটিস রোগীদের বিনামূল্যে ইনসুলিন সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্র হতে হাসপাতালে ভর্তি ননÑএমন রোগীদের হ্রাসকৃত মূল্যে ইনসুলিন দেওয়া হচ্ছে। এ রোগে আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং করা হচ্ছে, যেন তারা নিজেরাই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। বারডেমের আদলে দেশের বিভিন্ন জেলায় ডায়াবেটিক রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে ও হচ্ছে। এ রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগ নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া সরকারি প্রচারমাধ্যম, যেমন- বিটিভি, বেতার, পিআইডি, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম এ রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়াবেটিক রোগীদের সেবায় নেওয়া হচ্ছে বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে এর প্রতিষ্ঠার দিনটিকে (২৮ ফেব্রুয়ারি) ১৯৫৬ সাল থেকে জাতীয় ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে সরকারের আহ্বানে ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ (২০০৭ সালের ৬১/২২৫ নং প্রস্তাব)। তখন থেকেই প্রতিবছর ১৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সব সদস্য দেশ ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে বিভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে উদ্যাপন করে আসছে।

ডায়াবেটিস একটি নীরব ঘাতক। সরাসরি এ রোগে মানুষের মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম হলেও পরোক্ষভাবে এর কারণে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে বিশ্বব্যাপী। কারণ, এর প্রভাবে দেহে হাজারো রোগ বাসা বাঁধে। এসব রোগেই মূলত মারা যায় ডায়াবেটিক রোগী। জীবদ্দশায় বৃক্ক, যকৃত, হƒৎপিণ্ড, চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে মানুষ হয়ে পড়তে পারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পরিমিত আহার, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ব্যায়াম ও কায়িক শ্রম, সর্বোপরি সঠিক চিকিৎসা ডায়াবেটিক রোগীকে রাখতে পারে অনেকটাই সুস্থ এবং এনে দিতে পারে দীর্ঘ জীবন। প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণই এ রোগের সর্বোত্তম চিকিৎসা। সচেতনতাই পারে মানুষকে এ রোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে। তাই বিশ্বব্যাপী এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি আজ সময়ের দাবি।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..