মত-বিশ্লেষণ

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় জাপানি মডেল কতটা কার্যকর

সাধন সরকার: ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’এটা যেন জাপানিদের বেলায় সবচেয়ে বেশি সত্য। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় জাপানিদের সুনাম বিশ্বব্যাপী। যারা জাপান ভ্রমণ করেছেন বা জাপানিদের সম্পর্কে জেনেছেন, তারা বিষয়টি অবগত। জাপানিরা শুধু দেশটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে না, তারা কোথাও গেলে বা বিদেশ ভ্রমণ করলে, সে জায়গাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করে। ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও জাপানি দর্শক ও খেলোয়াড়রা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা ভুলে যাননি। সাধারণত খেলায় হেরে গেলে মন খারাপ থাকে, হƒদয় কিছু সময়ের জন্য হলেও বিষণœতায় ভরে যায়! তবুও যেকোনো পরিস্থিতিতে জাপানিরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা ভুলে যায় না। ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দল হেরে যাওয়ার পরও জাপানি দর্শকরা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছিলেন। খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুম পরিষ্কার করে তারপর সেখান থেকে বের হয়েছিলেন। জাপানের রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, অফিসরুমসহ জাপানজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ছাপ স্পষ্ট। জাপানের রাস্তাঘাটগুলোয় কোনো ডাস্টবিন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেখতে পাওয়া যাবে না। জাপানিরা চলাফেরার সময় সঙ্গে করে একটা আলাদা ব্যাগ সংরক্ষণ করে। সারা দিন কাজে বা চলাফেরার সময় যেসব বর্জ্য তৈরি হয়, তারা তা ওই ব্যাগে সংরক্ষণ করে এবং পরে তা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে রেখে আসে। জাপানে প্রায় প্রত্যেক বাসাবাড়ির নিচে নির্দিষ্ট ডাস্টবিন আছে। জাপানের মতো এমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জাতি খুব কমই দেখা যায়। যে জাতি যত বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সে জাতি তত বেশি গোছানো ও সুশৃঙ্খল। হতে পারে উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিশেষ ভ‚মিকা রয়েছে।

এবার প্রশ্ন হতে পারে, জাপান এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা পেল কোথা থেকে? সহজ উত্তর হলো, জাপানে শিশুবয়স থেকে বিদ্যালয়ে এবং পরিবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেয়া হয়। বিদ্যালয়গুলোয় শিশুদের দিয়ে নিজেদের ক্লাসরুম, বিদ্যালয়ের আশপাশ, টয়লেটসহ পাঠসংশ্লিষ্ট সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মতো ব্যবহারিক কাজ করানো হয়। পরিবারগুলোতেও ছোটকাল থেকে জাপানি শিশুরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা-দীক্ষা পেয়ে থাকে। শিশুদের জন্যও পরিবারে আলাদা আলাদা কাজ ভাগ করা আছে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর পাঠ নির্দিষ্ট করা আছে। জাপানে শিশুদের এই শিক্ষা দেয়া হয় যে, কোনো কাজই ছোট নয়। অন্যান্য পেশার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, তাদেরও গুরুত্ব ও মর্যাদার দিক দিয়ে কখনও খাটো করা হয় না। একথা সবাই জানে, যে জাতি শ্রমের মর্যাদা দিতে জানে, সে জাতির উন্নতি অবধারিত।

এবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাপানি মডেল কতটা কার্যকর সে ব্যাপারে আলোকপাত করা যাক। ঢাকা শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কয়েক বছর আগে রাস্তাগুলোর পাশে ফুটপাতে মিনি ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু সে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক আগেই। ঘিঞ্জি এই শহরে সরাসরি জনসাধারণ-সংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি নেয়ার আগে ব্যাপক জনসচেতনতা ও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে, যেটা ‘মিনি ডাস্টবিন প্রকল্পে’ করা  হয়নি। জাপানি মডেল বাংলাদেশে কার্যকর করার জন্য সবার আগে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোয় শিশুদের পড়াশোনার জন্য পাঠ্যসূচিতে সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর বিভিন্ন দেশের উদাহরণ ও পাঠ সংযোজন করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব শিশুকাল থেকেই শিশুদের মধ্যে প্রোথিত করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোয় ব্যবহারিক কাজের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের আশপাশ, শ্রেণিকক্ষসহ শিশুদের কাজের উপযোগী সব কাজে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজগুলোয় প্রণোদনা হিসেবে নম্বর ও পুরস্কার দিয়ে প্রেরণা জোগাতে হবে। পরিবারে শিশুরা যেসব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে পারে, সেসব কাজ শিশুদেরকে দিয়ে করাতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো শিশুদের দিয়ে করাতে পারলে শিশুদের মধ্যে ছোট বয়স থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি সচেতনতা গড়ে উঠবে। সরকারের তরফ থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বরোপ করে যদি কোনো প্রকল্প নেয়া হয়, তবে সেটি বাস্তবায়ন করার আগে সচেতনতা ও সতর্কতার ওপর ব্যাপকভাবে জোর দিতে হবে। সব এলাকায় একসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করে আগে কাজের অগ্রগতি যাচাই করা যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে রাস্তায় ময়লা না ফেলে নিজেদের কাছে রাখা নির্দিষ্ট ব্যাগে ময়লা সংরক্ষণ করার মতো কাজে গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি ইতিবাচক কাজের জন্য পুরস্কারেরও ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের ঘর, নিজের চারপাশ, নিজের জামাকাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। একদিকে ছোটকাল থেকে যদি শিশুদের পড়ালেখা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো ব্যবহারিক কাজে সংযুক্ত করা যায়, অপরদিকে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা ও গুরুত্বের ওপর জোর দেয়ার পাশাপাশি বিধিনিষেধ আরোপ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে অন্যান্য কাজের মতো নিত্যকাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন বাঙালি জাতিও বিশ্বের বুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মডেল হিসেবে পরিচিতি পাবে।

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..