দুরে কোথাও

পর্যটকদের পছন্দ সিটি ইন

মো. মহসিন হোসেন, খুলনা: ২০১২ সালের কথা। আইসিসি ম্যাচ রেফারি রোশন মহানামা এলেন খুলনায়। টেস্ট ভেন্যু হিসেবে শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম পছন্দ করলেন। এবার খেলোয়াড়দের আবাসন দেখবেন; কিন্তু তখনও সিটি ইন হোটেল পুরোপুরি চালু হয়নি। কিছুদিন আগে মাত্র ৪০টি কক্ষ নিয়ে যাত্রা শুরু করে হোটেলটি। রোশন মহানামাকে নিয়ে যাওয়া হলো সিটি ইন-এ। হোটেল পছন্দ হলো তার। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে তিনি বিসিবি কর্মকর্তাদের জানালেন। বিসিবি কর্তারা সিটি ইন কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহ সময় দিলেন। এ সময়ের মধ্যে দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের জন্য আরও ২০টি কক্ষ প্রস্তুত করতে হবে। আইসিসি ও বিসিবির শর্তমতো দুই দলের খেলোয়াড়দের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় ও বিদেশি খেলোয়াড়দের আবাসন সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল খুলনার টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা। সিটি ইন হোটেল সে সমস্যার সমাধান করে। খুলনা পায় টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের পর বাংলাদেশ সফরে এসে জিম্বাবুয়ে দল দুবার ও পাকিস্তান দল একবার সিটি ইন-এ থেকেই খেলায় অংশ নেয়। ২০১১ সালের পর খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের যতো খেলা হয়েছে, সব খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা এ হোটেলেই অবস্থান করেছেন বলে জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

পদ্মার পশ্চিম পাড়ে ২১ জেলার মধ্যে এ হোটেলই এখন দেশি-বিদেশি পর্যটক ও বহুজাতিক কোম্পানির অতিথিদের একমাত্র ভরসা। খুলনা শহরের শিববাড়ী মোড়ে ১৯ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে হোটেলটি। ভবনটিতে অতিথিদের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে। অতিথি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের দিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। হোটেলে রয়েছে অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম ও ফায়ার সিস্টেম।

হোটেল সিটি ইনের প্রতিষ্ঠাতা মো. আলমগীর হোসেন। তিনি হোটেল ম্যানেজমেন্টের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন। পরে বিখ্যাত হিলটন হোটেলে চাকরি করেছেন। বর্তমানে সিটি ইন হোটেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। সিটি ইনের উপদেষ্টা এসএম হাবিব বলেন, হোটেলটি মূলত পারিবারিক। পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে পরিচালনা করছেন। তিনি আরও বলেন, আমি দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকি না কেন, নিরাপত্তার বিষয়টি সেখানে বসেই মনিটর করে থাকি।

পরিচালক ওয়াহিদুর রহমান বলেন, পদ্মার এপারে বিদেশি অতিথির জন্য সিটি ইনের মতো ভালো ব্যবস্থা অন্য কোনো আবাসিক হোটেলে না থাকায় সবাই এখানেই অবস্থান করেন। ওয়াহিদ জানান, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট আমাদের হোটেলে ছিলেন। অন্যান্য অনেক দেশের রাষ্ট্রদূতও এখানে গেস্ট হিসেবে ছিলেন। সুন্দরবনে ঘুরতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অধিকাংশই সিটি ইন-এ থাকেন। এখানে অনেক সেমিনার হয়েছে বলে জানান ওয়াহিদ। বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক দুবার হয়েছে এ হোটেলে। ২৩ দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে জলবায়ু সম্মেলন ও ১৪

দেশের দূতাবাসের অ্যাটাশেদের নিয়ে সম্মেলন হয়েছে এখানে।

ওয়াহিদ বলেন, হোটেল ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। তিনি আরও বলেন, বড় ভাই মো. আলমগীর হোসেন দেশে আসার পর আমরা খুলনা নিউ মার্কেটের কাছে গ্রিলহাউস নামে একটি ফাস্টফুডের দোকান করি। এরপর খুলনার ঐতিহ্যবাহী রয়েল হোটেল ও ওয়েস্টার্ন ইন হোটেল লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন পরিচালনা করি। পরে ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমরা এ হোটেল প্রতিষ্ঠা করি। এ হোটেলে মুনাফা ভালো হলেও ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাংকঋণ শোধ করতে হয় বলে জানান ওয়াহিদ।

নিরাপত্তা ইনচার্জ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত পেটি অফিসার আবদুর রহিম বলেন, তিনিসহ তিনজন নিরাপত্তা ইনচার্জ রয়েছেন এখানে। অপর দুজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। তিন শিফটে তারা অতিথিদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে জানান নিরাপত্তা ইনচার্জ। নিজস্ব নিরাপত্তা ছাড়াও পুলিশের একটি টিম সার্বক্ষণিক হোটেলের নিরাপত্তায় থাকে বলে জানান রহিম।

 

কক্ষ সংখ্যা ও ভাড়া

হোটেল সিটি ইন-এ মোট ১০৬টি কক্ষ আছে। এর  মধ্যে ২৫টি এক্সিকিউটিভ স্যুট। এগুলোর ভাড়া ৫ হাজার টাকা। ভ্যাট ও রুম সার্ভিস ১ হাজার টাকা। ফ্যামিলি ডিলাক্স স্যুট রয়েছে ২৫টি। ভাড়া ৪ হাজার ২০০ টাকা। কাপল স্যুট ৪ হাজার টাকা, সিঙ্গেল স্যুট ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ডিলাক্স টুইন ৩ হাজার টাকা। ডিলাক্স কাপল ২ হাজার ৮০০ টাকা। ডিলাক্স সিঙ্গেল ২ হাজার ২০০ টাকা। স্ট্যান্ডার্ড টুইন ২ হাজার ৬০০ টাকা। স্ট্যান্ডার্ড কাপল ২ হাজার ৪০০ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড সিঙ্গেল ১ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতিটি কক্ষ ভাড়ার ক্ষেত্রে ১৫ পার্সেন্ট ভ্যাট, ৫ পার্সেন্ট সার্ভিস চার্জ ও ১৫ পার্সেন্ট রুম সার্ভিস যোগ করতে হবে। গ্রুপ ও দীর্ঘদিন অবস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ ডিসকাউন্টের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া একটি টাইগার স্যুট আছে, যেটির ভাড়া ২০ হাজার টাকা।

 

সুযোগ-সুবিধা ও সেবা

চব্বিশ ঘণ্টা রুম সার্ভিস দেওয়া হয়। প্রতিটি কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কক্ষে ফ্রিজের ব্যবস্থা আছে। বিজনেস সেন্টার ও সেক্রেটারিয়েল সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে। প্রিন্টার, স্ক্যানার, কুরিয়ার সার্ভিস ও ফটোকপি মেশিনের সুবিধা তো আছেই। কার পার্কিং, লন্ড্রি সার্ভিস, স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর ও সার্বক্ষণিক লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ট্যুর ডেস্ক থেকে সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার, মাইকেল মধুসূধন দত্তের বাড়িসহ যে কোনো দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে পৌঁছানো ও রেন্ট-এ-কারের ব্যবস্থা রয়েছে। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিল গ্রহণ করা হয়। মানি এক্সচেঞ্জ ফ্যাসিলিটি রয়েছে। জেন্টস পার্লার ও চুল কাটার ব্যবস্থা আছে। অবসরে বিলিয়ার্ড খেলার সুযোগ পাবেন অতিথিরা। আছে ডিজিটাল ডোর লক সিস্টেম ও পারসোনাল ডিজিটাল লকার ব্যবস্থা। নামাজের জন্য রয়েছে মসজিদ।

হোটেল সিটি ইনে সুইমিংপুল রয়েছে। যেখানে গরম ও ঠাণ্ডা পানিতে সুইমিং করতে পারেন অতিথিরা। ব্যায়ামের জন্য জিমও রয়েছে। ছোট-বড় তিনটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে এ হোটেলে। সেখানে ইউরোপীয়, ভারতীয়, জাপানিজ ও চাইনিজ খাবারের ব্যবস্থা আছে।

 

কনফারেন্স হল

হোটেল সিটি ইন-এ দুটি কনফারেন্স রুম রয়েছে। একটিতে ৭০০, অন্যটিতে ৩০০ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী কনফারেন্সে আসা অতিথিদের জন্য লাঞ্চ কিংবা ডিনারের ব্যবস্থা করে থাকে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..