ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার : বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত আর সবুজ পাহাড়ের মিলনে পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভবনায় কক্সবাজার। সমুদ্রসৈকত ছাড়াও রয়েছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। পর্যটনসেবার নামে কক্সবাজারের কলাতলীতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউস। সৈকতের বালিয়াড়িতে নির্মিত হয়েছে কয়েকশ ঝুপড়ি দোকান। রয়েছে সমুদ্রের ভাঙন। ফলে দিন দিন শ্রীহীন হয়ে পড়ছে কক্সবাজার। এরই সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে সুপেয় পানির সংকট। সুপেয় পানির তীব্র এ সংকট হতে পারে পর্যটনশিল্প বিকাশে বড় বাধা। দ্রুত এ সমস্যার মোকাবিলায় পদক্ষেপ না নিলে চরম প্রভাব পড়বে রাজস্ব আয়ের এ খাতে।
তথ্য বলছে, পর্যটক সেবার নামে কক্সবাজারের কলাতলীতে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউসে প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন। এসব আবাসিক প্রতিটি ভবনে দুই থেকে তিনটি গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ থেকে প্রতিদিন উত্তোলন করে চাহিদা মেঠানো হয় পানির। এছাড়া কক্সবাজার পৌরসভার দুই লাখের বেশি বাসিন্দা এবং ১২ লাখের অধিক রোহিঙ্গার জন্য উত্তোলন করা হয় আরও ৩০ লাখ লিটারের অধিক পানি। মাটির নিচ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে দিন দিন পানির স্তার নিচে নামছে। পানিতে বাড়ছে স্যালাইনের মাত্রাও। এ অবস্থায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে। দিন দিন সুপেয় পানির তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে এ সংকট পর্যটনশিল্প বিকাশে বড় বাধা হতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছে, এ সংকট সমাধানে কাজ করছে সরকার।
হোটেলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্ষাকাল ছাড়া অন্য যেকোনো মাসে ২০০ থেকে ৩০০ ফুট গভীরে নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন ধ্বংস এবং অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের ফলে এমন অবস্থা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্মার্ট এনভায়রনমেন্ট গড়তে পারলে স্মার্ট পর্যটন গড়ে উঠতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয় প্রয়োজন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপেয় পানির সংকট পর্যটনশিল্পকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনের মতো পর্যটন কেন্দ গুলোয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেভাবে নিচে নামছে ও লবণাক্ততা বাড়ছে, তা ভবিষ্যৎ পর্যটনের জন্য চরম হুমকি। একই
সঙ্গে স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় বাধা এবং পর্যটকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। দ্রুত এ সংকট মোকাবিলা করা না গেলে দীর্ঘ মেয়াদে এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো ও বিকল্প পানির উৎস নিশ্চিত বা টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ এবং পর্যটকদের পানিসাশ্রয়ী হতে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তারা।
কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মইনুল হাসান পলাশ বলেন, যেখানে সবকিছুই অপরিকল্পিত, সেখানে সুপেয় পানি সংকট এ শিল্পকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। তাই দ্রুত এ সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারকে পর্যটকদের কাছে আকৃষ্ট করতে বিনোদন, ইকো-ফ্রেন্ডলি আবাসন, নিরাপত্তাসহ সুপরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে।
তথ্যমতে, স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গভীর নলকূপ বসানো। কিন্তু কলাতলীতে অপরিকল্পিতভাবে ৫০ ফুটের মধ্যেই বোম-মোটর সংযুক্ত একাধিক গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এছাড়া নির্বিচারে গাছপালা ধ্বংস করা ও ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটার কারণে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ সুরক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নসরুল্লাহ।
তিনি বলেন, সুপেয় পানি সংকট দেখা দিলে পর্যটনশিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, সরকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার জন্য ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। একই সঙ্গে সার্ফেস ওয়াটারের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো ছাড়া এ সংকট দূর করা সম্ভব হবে না।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post