প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পর্যটন বিকাশে প্রতিবেশী দেশ থেকে শিক্ষা নিতে হবে

 

আব্দুল্লাহ আল নোমান: বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনশিল্পের প্রভাব ক্রমে বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাত বড় ভূমিকা পালন করছে। পর্যটনের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন বলছে, দেশজ আয়ের (জিডিপি) ১০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। প্রতি ১১টি চাকরির মধ্যে একটির ব্যবস্থা হয় এ খাতকে পুঁজি করে। পর্যটনের মাধ্যমে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি হয়, যা বৈশ্বিক রফতানির ৭ শতাংশ।

বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট, পর্যটনের ফলে সর্বাধিক উপকৃত হলো উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। ২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম গ্লোবাল ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইকোনমিক ইস্যুজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে এশিয়ার দেশগুলোয় পর্যটন খাত থেকে সর্বাধিক হারে জিডিপিতে অবদান রাখছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ হার ৬-এর ওপরে। অর্থাৎ এশিয়ায় এর ব্যাপকতা জোরালো।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ব্যাপকতার জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করলেও তা প্রকৃতপক্ষে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। দেশের পর্যটন স্পটগুলো মূলত কক্সবাজার, তিনটি পার্বত্য জেলাসহ (বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি) চট্টগ্রামকে নিয়ে একটি বলয়; সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত সুন্দরবনকে নিয়ে আরেকটি; বৃহত্তর সিলেটের হাওর ও পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চল পর্যটন স্পট হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রাচীন আমলের নিদর্শন, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। মোদ্দাকথা, সারা দেশেই পর্যটন বিকাশ হতে পারে।

এ খাত থেকে অর্থ আহরণে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও আমরা যোজন যোজন পিছিয়ে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন কিংবা রামসারসাইটখ্যাত টাংগুয়ার হাওরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই চলে না, পাশাপাশি দরকার শিল্প বিকাশের কার্যকর পদক্ষেপ।

দেশ ভিত্তিতে পর্যটকদের দুই ভাগ করা যায়Ñঅভ্যন্তরীণ ও বিদেশি পর্যটক। অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার ফলে তারা বিশেষত তরুণরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণে উৎসাহিত হচ্ছেন। কিন্তু বিদেশি পর্যটকের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র আমাদের চোখে ধরা দেয়। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিসংখ্যান মতে, নব্বইয়ের দশকে দেশে বিদেশি পর্যটকের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০০০-২০১০-তে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৯-য়ে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে পর্যটন থেকে আয় হয়েছে ছয় হাজার মিলিয়ন টাকা, যা ২০১০ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিয়নে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

আমাদের দেশে বিদেশি পর্যটকরা নানা উদ্দেশ্যে আসেন। শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আসেন সবচেয়ে বেশিÑ৪৬ শতাংশ। ৪২ শতাংশ আসেন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ বাণিজ্যের জন্য এলে তারা দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণের সুযোগ নেন। যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, বিদেশি পর্যটকের আগমন দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখে, তা প্রমাণিত। তাই বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে বিশেষভাবে উদ্যোগী হওয়া উচিত।

এ দেশে পর্যটন খাত বিকাশের অন্তরায় হিসেবে যেসব কারণ বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনাই সর্বাধিকবার আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পর্যটন স্পটগুলোকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা প্রাপ্তিতে ভোগান্তি প্রভৃতিও পর্যটনশিল্প বিকাশের অন্তরায়। কক্সবাজার ও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পট ছাড়া দেশের অধিকাংশ দর্শনীয় স্থানগুলোয় যাতায়াতব্যবস্থা নাজুক। বাহনের ফিটনেস নিয়ে আছে প্রশ্ন, স্পটের কাছাকাছি চিকিৎসাসেবার সুবিধা আছে খুব কম ক্ষেত্রে। সুন্দরবনে গমনের জন্য বিদেশিদের ভ্রমণের উপযোগী বাহন নেই বললেই চলে।

সাংস্কৃতিক বিভাজনও একটি কারণ হিসেবে বিবেচ্য। বিদেশের একজন পর্যটক নিশ্চয়ই তাদের মতো করে সময় কাটাতে চাইবেন। কিন্তু তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে কি? দেরিতে হলেও সরকার কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকদের উপযোগী করে বিশেষ পর্যটন স্পট বানাতে যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

আমাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা হলোÑপর্যটন বিষয়ের বিভিন্ন হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কিংবা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে গেলেই এর প্রমাণ মেলে। এরই মধ্যে পর্যটন খাতের প্রসারে জন্য সরকার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। সরকারি উদ্যোগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল আছে আমাদের? যেখানে এশিয়ায় দেশগুলো জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি আসে পর্যটন থেকে, সেখানে আমাদের কেন ২ দশমিক ২ শতাংশ? গবেষকরা বলছেন, পর্যটনে বাংলাদেশের নেতিবাচক দিকগুলোর ফলে লাভবান হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ। বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী পর্যটকরা বর্তমানে ভারত ভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। ভারতের এ সাফল্যের পেছনের কারণ হলোÑবিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণোপযোগী পরিবেশ উপহার দেওয়া। যাতায়াতব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, হোটেলসুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ দেশটির সাফল্যের রহস্য। আরেক প্রতিবেশী নেপালের অর্থনীতি পর্যটনের

ওপর টিকে আছে।

ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন এ বার্তা দিচ্ছে যে, ২০৩০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা হবে ১৮০ কোটি। তাই দেশের পর্যটন খাতকে প্রকৃতপক্ষে শিল্পে রূপান্তর করতে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগোনো উচিত।

 

শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়