প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ পেয়েও ঋণখেলাপি ওয়েস্টার্ন মেরিন

নিয়াজ মাহমুদ : প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা দেখিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল ‘ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড’। উচ্চ সুদে অধিক ঋণ নিয়ে এখন বেকায়দায় পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটি। এদিকে জাহাজের প্রধান ক্রেতা ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পর গত দুই বছরে সক্ষমতার চেয়ে অধিকসংখ্যক জাহাজ তৈরির অর্ডারও রয়েছে ওয়েস্টার্ন মেরিনের হাতে। কিন্তু পরিচালকদের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক আর্থিক ধারণা না থাকায় শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় কোম্পানিটির নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করছেন কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেড় শতাধিক আন্তর্জাতিকমানের জাহাজ নির্মাণ করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এর মধ্যে ১২০টি জাহাজ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহƒত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৫টি জাহাজ রফতানি করেছে। এর মাধমে কোম্পানিটি প্রায় আট কোটি মার্কিন ডলার বা ৬৪০ কোটি টাকা আয় করেছে। এরপরও কোম্পানিটি শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় প্রথম দিকে রয়েছে।

ঋণখেলাপির তালিকায় ওয়েস্টার্ন মেরিনের না উঠে আসার বিষয়ে কথা হয় কোম্পানিটির একাধিক উদ্যোক্তা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা শেয়ার বিজকে বলেন, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ১৪ জন। এর মধ্যে তিনজন স্বাধীন পরিচালক রয়েছেন। বাকি ১১ জন পরিচালক পদে রয়েছেন উদ্যোক্তারা। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেসব পরিচালক রয়েছেন তারা মূলত মেরিন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। হিসাববিজ্ঞান বিষয় সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা না থাকায় কোম্পানিটির তারল্য সংকটে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে ঋণের বোঝায় শীর্ষস্থানীয় ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে কোম্পানিটি।

কথা হয় ওয়েস্টার্ন মেরিনের টেকনিক্যাল পরিচালক আরিফুর রহমান খানের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের তৈরিকৃত জাহাজের গুণগত মান ভালো হওয়ায় এখন দেশি-বিদেশি শিল্পগ্রুপ আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থার জাহাজও নির্মাণ করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। জাহাজ নির্মাণের প্রচুর অর্ডার আসছে। কিন্তু অতীতের ব্যাংকঋণের সুদের ঘানি ও বর্তমান ঋণের বোঝায় হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিচালনা পর্ষদকে।’

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটি চলতি বছরে সরকারি ও দেশি-বিদেশি জাহাজ তৈরির অর্ডার পেয়েছে। আর এ কাজ সম্পন্ন করতে উৎপাদনসক্ষমতা আরও বাড়াতে হচ্ছে কোম্পানিটির। নিয়োগ করতে হচ্ছে অতিরিক্ত জনবল। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে ব্যবহারের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষায়িত জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছে চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মাণকারী এ প্রতিষ্ঠানটি। জাহাজটিতে মাছ ধরা ও সংরক্ষণের অত্যাধুনিক যন্ত্র সংযোজন করা হবে। এর মাধ্যমে উচ্চপ্রযুক্তির মাছ ধরার জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ পেল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া দেশের অন্যতম শিল্পগ্রুপ এস আলমের জন্য ২০টি লাইটার জাহাজ নির্মাণ করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। এছাড়া চট্টগ্রামের পায়রা বন্দরের জন্য জাহাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। এ নৌযানটি হবে ৩৩.৫০ মি. দীর্ঘ। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এটি হস্তান্তর করা হবে।

জানা যায়, ব্যাপক সম্ভাবনা দেখিয়ে ২০১২ সালে একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেয় ওয়েস্টার্ন মেরিন। এরপরই শুরু হয় জাহাজের প্রধান ক্রেতা ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা। এ সংকট কোম্পানিটির পর্ষদ যথাযথভাবে কাটিয়ে উঠতে না পারায় ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পারা ও চাহিদানুযায়ী নগদ টাকা না থাকায় ক্যাশ ফ্লো কমে আসে।

এরপর ২০১৪ সালে ওয়েস্টার্ন মেরিন আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করে। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে সাড়ে চার কোটি শেয়ার বিক্রি করেছে। আইপিওতে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতি শেয়ারের জন্য ৩৫ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৫ টাকা প্রিমিয়াম। পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকঋণ পরিশোধ, অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় বাবদ খরচ করা হলেও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন করায় কাক্সিক্ষত জাহাজ তৈরির অর্ডার পায় কোম্পানিটি। গুণগত মান ঠিক রেখে যথাসময়ে দেশি-বিদেশি জাহাজগুলো ডেলিভারি দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে কোম্পানিটি সক্ষম হলেও উচ্চ সুদে নেওয়া ঋণের ঘানি টানতে হচ্ছে ‘জেড’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটিকে।

সর্বশেষ ২০১৪ হিসাববছরে শেয়ারহোল্ডারদের পাঁচ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দেয় ওয়েস্টার্ন মেরিন। সে হিসাববছরে তাদের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল দুই টাকা ৩২ পয়সা। তবে এরপর যথাসময়ে টানা দুই হিসাববছরের এজিএম আয়োজনে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। নির্ধারিত সময়ের পর ২০১৫ ও ২০১৬ হিসাববছরের এজিএম করার জন্যই বিধি মোতাবেক উচ্চ আদালতে আবেদন করেন তারা।

এদিকে ২০১৫ হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিকের পর কোম্পানিটির কোনো আর্থিক ফলাফলও প্রকাশিত হচ্ছে না। সর্বশেষ অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ হিসাববছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই, ২০১৪-মার্চ, ২০১৫) ইপিএস ছিল ৬৯ পয়সা, আগের বছর একই সময়ে যা ছিল দুই টাকা এক পয়সা। নির্ধারিত সময়ে এজিএম করতে না পারায় ২০১৫ সালের শুরুতে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডকে ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা স্টক একচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, এ কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ১২০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ৭০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩৭ দশমিক ৩১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। বাকি ৪৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ারের অংশীদার সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই শীর্ষ ঋণখেলাপি ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ তালিকায় মূল মার্কেটের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ও অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ রয়েছে। এছাড়া ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটের মুন্নু ফেব্রিকস, সালেহ কার্পেট মিলস, এপেক্স ওয়েভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস এবং আলফা টোব্যাকো ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি রয়েছে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়। এ তালিকা প্রকাশের পর থেকে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের শেয়ারদর কমতে থাকে। গত সপ্তাহে ডিএসইর সাপ্তাহিক দর হারানোর শীর্ষ বা টপটেন লুজারের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে কোম্পানটি।