দিনের খবর প্রথম পাতা

পলাতক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি নিলামে তুলেছে ঢাকা ব্যাংক

১২৮ কোটি টাকা খেলাপি

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চিটাগং ইস্পাত লিমিটেড। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদের মালিকানাধীন এইচআর গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এটি। এইচআর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন হারুনুর রশিদ। এক সময়ের শীর্ষ ব্যবসায়ী এখন পলাতক আসামি। এ খেলাপি গ্রাহকের সম্পত্তি নিলামে তুলেছে ঢাকা ব্যাংকের মুরাদপুর শাখা।

সূত্রমতে, ব্যবসায় প্রয়োজনে চিটাগং ইস্পাত লিমিটেড ঋণ সুবিধা নিয়েছিল ঢাকা ব্যাংক মুরাদপুর শাখা থেকে। প্রথমদিকে নিয়মিত পাওনা পরিশোধ করলেও পরে তা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ খেলাপি ঋণ আদায়ে ২০১২ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। এ মামলা নিষ্পত্তি হলে একই আদালতে ২০১৯ সালে মামলা জারি করা হয়েছিল। এ মামলায় গত ২৮ জানুয়ারি আদালত খেলাপি ঋণ আদায়ে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির সনদ প্রদান করে।

এ সনদের ফলে ব্যাংকটির মুরাদপুর শাখা পাওনা আদায়ে নিলামে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিটাগং ইস্পাতের কাছে মোট খেলাপি পাওনা ১২৮ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ৫২৯ টাকা। আর এসব পাওনার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির পাহাড়তলী, জাহানারাবাদ এলাকায় মোট দুই দশমিক ৮১৩ একর জমি আছে, যা আগামী ২৪ মার্চ নিলামে বিক্রয় করা হবে। এতে আগ্রহীরা উপস্থিত হয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদের জাহাজ ভাঙা শিল্পের মাধ্যমে ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হলেও পরে ভোজ্যতেলের রিফাইনারি, স্টিল মিল, প্লাস্টিক মিলসসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গড়ে তুলেন এইচআর গ্রুপ। গ্রুপের সহযোগী রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, ন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রুবাইয়া প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চিটাগং ইস্পাত লিমিটেড, এইচ স্টিল ও আমানত স্টিল লিমিটেড ইত্যাদি।

প্রথমদিকে এইচআর গ্রুপ জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় ভালো মুনাফা করেছিল। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধও ভালো ছিল। পাশাপাশি হারুনুর রশিদ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিপুল পরিমাণে শেয়ারের মালিক হয়ে পরিচালকও হন। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ে তদবির করে দ্রুত সময়ে ঋণ পেয়েছেন, যা ইস্পাত খাত, তেল পরিশোধনাগার স্থাপন, জমি কেনায় বিনিয়োগ করেন। আর এসব প্রতিষ্ঠানের নামে অগ্রণী, সাউথইস্ট, মার্কেন্টাইল, এনসিসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম, আল-আরাফাহ্, রূপালী, যমুনা, প্রাইম, শাহ্জালাল ইসলামী ও জনতা ব্যাংকসহ মোট ২২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আছে।

যদিও ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করে গ্রুপের কর্ণধার হারুনুর রশিদ ও অন্যান্য পরিচালকরা আড়ালে চলে যান। ফলে গ্রুপটির কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দিনের পর দিন যোগাযোগ করে পাচ্ছেন না পাওনা টাকা। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পলাতক ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদের মালিকানাধীন রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও চিটাগং ইস্পাতের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে ৮৩০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার ঋণখেলাপির মামলা চলমান। এর মধ্যে রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে রয়েছে ৫৪৮ কোটি ১২ লাখ টাকার ছয়টি মামলা। বাকি ২৮২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার তিনটি মামলা চিটাগং ইস্পাতের বিরুদ্ধে। এছাড়া এ গ্রুপের অন্যান্য সহযোগীর খেলাপি পাওনা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে লেনদেন থাকা অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি চেক ডিজঅনারের ফৌজদারি মামলাও রয়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, চিটাগং ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবসায়িক ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর শেখ মুজিব রোডে ফারুক চেম্বার। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য এইচআর গ্রুপের অফিসে গেলেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুনুর রশিদকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার মন্তব্য নেয়া যায়নি। একজন লোক অফিসে থাকলেও তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। তিনিও গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলতে রাজি হননি। ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডে মুরাদপুর শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নুর কাশেম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চিটাগং ইস্পাত লিমিটেড আমাদের খেলাপি গ্রাহক, যেটি ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদের মালিকানাধীন। গত জানুয়ারি মাসের দিকে আদালত খেলাপি পাওনা আদায়ে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয়ের সনদ প্রদান করে। এর আলোকে আমরা নিলামে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তার সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। তবে তার একজন এজিএম যোগাযোগ করেন। এ যোগযোগে কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..