সারা বাংলা

পলাশের হরিজন সদস্যরা চাকরি হারানোর পর বাসস্থানও হারাচ্ছেন

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী: নরসিংদীর ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানায় বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের অর্ধশতাধিক সদস্য চাকরি হারানোর পর এবার থাকার জায়গাটাও হারাচ্ছেন। সবাই পরিষ্কার-পরিচচ্ছন্নতার জন্য দিনরাত এগিয়ে গেলেও হরিজন সম্প্রদায় এই দুঃসময়ে কাউকে পাশে পাচ্ছে না। এ অবস্থায় হতাশা আর আতঙ্কের মাঝে দিন পার করছেন তারা।

জানা গেছে, ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কর্মের জন্যে বসবাস করছে কয়েকটি হরিজন পরিবার। কারখানা কর্তৃপক্ষের চাকরির সুবাধে তাদের কেউ অফিসে, কেউ বাইরে, আবার কেউবা স্কুল-কলেজে ঝাড়–দাড়ের কাজ করে আসছিলেন। সম্প্রতি কারখানায় সংস্কারকাজ শুরু হলে তাদের চাকরিচ্যুত করে কর্তৃপক্ষ। এবার তাদের বাসস্থান থেকেও বিতাড়িত করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি ঘোড়াশাল ইউরিয়া সারকারখানার আবাসিক এলাকায় বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নারী, পুরুষ, শিশুসহ সবাই বাইরে বসে আছে। চোখে-মুখে হতাশা আর আতঙ্কের ছাপ। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আমরা গরিব, আমরা জাতে ছোট, তাই আমাদের কেউ চোখে দেখে না, মূল্যায়নও করে না। আমাদের থাকার ঘরে কারখানা কর্তৃপক্ষ এসে তালা দিয়ে গেছে, এখন আমরা কোথায় যাব? কী করব? কোথায় রাত কাটাব? আমাদের নেই কোনো বাড়িঘর, কেউ দেয় না বাসাভাড়াও।’ কথাগুলো বলার সময় অনেকের চোখেই জল লক্ষ করা গেছে।

একটু এগিয়ে গিয়েই চোখে পড়ে একটি দরজায় তালা ঝুলছে। বিষয়টি জানতে চাইলে পঙ্কজ বাসফোর বলেন, ‘আমরা যাতে বাসায় রাতযাপন না করতে পারি, সেজন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ এসে তালা দিয়ে গেছে।’

জানা গেছে, ঘোড়াশাল সার কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও বিভাগীয় প্রধান দিল আফরোজ আক্তারের গত ২২ জুন স্বাক্ষরিত ০২৩/৫/৬০৮ স্মারকে বলা হয়েছে, কারখানার আবাসিক এলাকার ই-টাইপ ও এফ-টাইপে বসবাসকারী যেসব স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি থেকে বাদ পড়েছেন এবং অবসরে গেছেন, তাদের মধ্যে যারা বাসা ছাড়েননি তারা পাঁচ দিনের মধ্যে বাসা ছেড়ে না দিলে কর্তৃপক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হবে। এর পরও মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্যরা এখনও বসবাস করছেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্যদের আবার কারখানা কর্তৃপক্ষ বাসা ছাড়ার নির্দেশ দিলে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ পলাশ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসন সাপেক্ষে ব্যবস্থা করার জন্য গত ২৭ আগস্ট পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি লিখিত আবেদন জানায়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করার জন্য পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা ইয়াসমিন ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্প পরিচালক বরাবর একটি নির্দেশনা প্রদান করেন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ হরিজন সম্প্রদায়কে পুনর্বাসন না করেই তাদের বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়।

এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ নরসিংদী জেলা শাখার যুব ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক চন্দন বাসফোরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি আগে এই বাসায় থেকে পার্শ^বর্তী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করতাম। এখন ওখানেই বাসা পেয়েছি। কিন্তু এখানে আমার স্বজনরা থাকেন। তাদের কোথায় নিয়ে যাব, কোথায় তারা বাসা বাঁধবে?’

বাংলাদেশ হরজিন যুব ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ও সেখানে বসবাসকারী পঙ্কজ বাসফোর বলেন, ‘আমার বাবা-মা এখানে থেকে কারখানায় কাজ করেছেন। কর্তৃপক্ষ আমাদের সবাইকে চাকরিহারা করেছে। এখন থাকার বাসস্থানও নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পুনর্বাসন সাপেক্ষে ব্যবস্থা করার জন্য। আমরাও তা-ই দাবি জানাই।’

সংগঠনটির পলাশ শাখার সভাপতি চন্দন বাসফোর ও সাধারণ সম্পাদক কানাই বাসফোর মলিন কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের বাবা-চাচারা এখানে থেকে চাকরি করেছেন। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন জোর করে আমাদের চাকরি কেড়ে নিয়ে এখন থাকার ব্যবস্থাটাও নিয়ে নিচ্ছে। এখন আমরা কোথায় যাব? কেউ আমাদের বাসাভাড়া দেয় না। তাই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি।’

এ বিষয়ে ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা সিবিএ সভাপতি আমিনুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ‘যেহেতু দুটি কারখানাকে একত্রিত করে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তাই তাদের সবার প্রয়োজন না থাকায় কর্তৃপক্ষ তাদের বাদ দিয়েছে। তবে তাদের পুনর্বাসন ছাড়া বাসা থেকে বিতাড়িত করা অমানবিক, কারণ তাদেরকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। তারা পারিবারিকভাবেই থাকতে পছন্দ করে। তবে হঠাৎ করে বাসায় তালা মারার ঘটনাটি বসে মীমাংসা করার চেষ্টা করব।’

এ বিষয়ে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার প্রকল্প ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) অহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কারও চাকরি খাইনি। এছাড়া আমরা কাউকে বাসা ছাড়ার জন্য নির্দেশও দিইনি। তবে তাদের কারখানা কী করেছে, সেটা তাদের বিষয়।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..