মত-বিশ্লেষণ

পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা জরুরি

আনোয়ারা বেগম: তাওয়াফ সেদিন স্কুল থেকে তৌহিদাকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাসায় ফিরছিল। তৌহিদার স্কুল বাসার কাছাকাছি বলে মা দুজনকে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই বাসায় ফিরছিলেন। কিছুদূর আসতে না আসতেই তাওয়াফ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘আপু আপু, দেখো কতগুলো ঘুড়ি উড়ছে।’ মা তাকিয়ে দেখেন, টেলিফোন ও বিদ্যুতের তারে আটকে বিভিন্ন রঙের অনেক পলিথিন বাতাসে উড়ছে, আর তা দেখে ছোট্ট তাওয়াফ ঘুড়ি ভেবে আনন্দ পাচ্ছে।

মা বললেন, ‘এগুলো ঘুড়ি নয়, বাবা, এগুলো হলো বিভিন্ন রঙের পলিথিন!’ ব্যবহার করার পর বহুতল ভবনের জানালা অথবা বারান্দা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া পলিথিনের ব্যাগগুলো টেলিফোন ও বিদ্যুতের তারে আটকে থাকে, যা তাওয়াফের মতো অনেক শিশুই ঘুড়ি ভেবে ভুল করে। শুধু টেলিফোন বা বিদ্যুতের তারেই নয়, প্রায় সবখানেইÑরাস্তার ধারে, নর্দমার পানিতে, ড্রেনে, ডাস্টবিনে অগণিত ফেলে দেওয়া পলিথিনব্যাগ ও প্লাস্টিক কন্টেইনারের ছাড়াছড়ি। জলে, স্থলে, বায়ুতেÑসব জায়গায় যেন পলিথিনের রাজত্ব।

পলিথিন হচ্ছে প্লাস্টিকেরই একটি ধরন। এটি এমন একটি পদার্থ, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং পরিবেশদূষণের উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্লাস্টিক হলো এক ধরনের কৃত্রিম বস্তু, যা রাসায়নিক পদার্থ থেকে তৈরি হয়। নানা ধরনের জৈব ও অজৈব অ্যাডিটিভ ব্যবহার করা হয় পলিথিনব্যাগ ও প্লাস্টিকে। অ্যাডিটিভগুলোর মধ্যে প্রায় সবই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নানা কর্মোদ্যোগের সঙ্গে একটি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। কিন্তু দিবস পালন করলেও নানা কারণে আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বর্তমানে ভয়াবহ হুমকির মুখে। পলিথিন পরিবেশদূষণের উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম উপাদান হওয়ায় প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করার আহ্বানে ২০১৮ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘বিট প্লাস্টিক পলিউশন।’

এই পলিথিন ও প্লাস্টিক পলিউশন থেকে আমাদের নিজেদের এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে নারীদের, কারণ নারীদের কাছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজš§ রক্ষিত। তাই নারীদের এ বিষয়ে সচেতন হতেই হবে। সবার আগে তাকে জানতে হবে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্বন্ধে।

পলিথিন ব্যবহার করে আমরা মাটিতে যেখানে-সেখানে ফেলে দিই। পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় দীর্ঘদিন প্রকৃতিতে অধিকৃত অবস্থায় থাকে। ফলে পলিথিন মাটিতে সূর্যালোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। তাছাড়া পলিথিন পচে না বলে পলিথিন মাটির উর্বরতাশক্তিকে কমিয়ে দেয় এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা তৈরি করে। ফলে মাটি মৌলিকত্ব হারাচ্ছে। এ রকম মাটিতে ভৌত কাঠামো স্থাপন করলে তা দুর্বল হতে পারে। পলিথিন ব্যাগের সহজলভ্যতা ও বহনের সুবিধার কারণে বাসাবাড়িতে তরিতরকারির খোসা, মাংস ও মাছের অপ্রয়োজনীয় অংশ, খাওয়ার পরের ময়লা, বাড়িঘর ঝাড়– দেওয়ার পর ময়লা ও অন্যান্য আবর্জনা পলিথিন ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগের মুখে গিট দিয়ে ডাস্টবিনে বা রাস্তার পাশে ফেলা হয়। সেই ময়লা আবর্জনাগুলো পলিথিনের ব্যাগে বন্ধ অবস্থায় থেকে মারাত্মক দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে পরিবেশ দূষণ করে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে গিয়ে পলিথিন ড্রেন ও ম্যানহোলে ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং নানা ধরনের পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেসব পলিথিন নদী, খালবিল ও পুকুরে ফেলা হয়। সেসব পলিথিন না পচে নদী, খালবিল ও পুকুরের তলদেশে জমা হয়ে তলদেশ ভরাট করে ফেলে। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গার তলদেশ থেকে বর্জ্য অপসারণের ফলে দেখা গেছে, উত্তোলন করা বর্জ্যরে অধিকাংশই পলিথিন ব্যাগ। প্লাস্টিক ব্যাগে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা মাটিতে চুইয়ে চুইয়ে ঢুকে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে এবং মানবদেহের ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে। সংক্রমণ ঘটায় ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে। এই পানি গ্রহণের ফলে তা আমাদের খাদ্যচক্রে ঢুকে যাচ্ছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের রাসায়নিক পদার্থের বিরূপ প্রভাব পড়ছে মাছ ও অন্যান্য জলজ পোকা, জীব ও গাছপালার ওপর। ছোট ছোট প্লাস্টিককণা মাছেরা খাবার ভেবে সরাসরি খেয়ে ফেলতে পারে বলে সেই মাছ গ্রহণের ফলে বিষাক্ত পদার্থ মিশে যাচ্ছে মানুষের খাদ্যচক্রে। তাছাড়া গরম খাবার পলিথিন অথবা প্লাস্টিকের পাত্রে রেখে সেই খাবার খেলে ক্যানসার ও চর্মরোগের সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায় বহুগুণ। পলিথিনে মাছ, মাংস, কাঁচা শাকসবজি ও ফলমূল প্যাকিং করলে তাতে অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয়। ফলে প্যাকিং করা বস্তু দ্রুত পচে যায়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পলিথিন দিয়ে মোড়ানো মাছ, মাংস, শাকসবজিসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য খুব সহজেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়, যা চর্মরোগ ও ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।

উজ্জ্বল রঙের পলিথিনে রাখা খাবার পলিথিনে থাকা সিসা ও ক্যাডমিয়ামের সংস্পর্শে আসায় তা শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তা চর্মপ্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। পলিথিনে এক ধরনের রেডিয়েশনের সৃষ্টি হয় বলে এতে রাখা মাছ-মাংস বিষাক্ত হয়ে যায়। এছাড়া বাড়িতে অথবা বাড়ির পাশে ফেলে দেওয়া পলিথিন বা প্লাস্টিকের কন্টেইনারে জমে থাকা পানি মশা-মাছির জš§ দিতে পারে, যা থেকে ডেঙ্গুজ্বর, ফাইলেরিয়া, ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য রোগ ছড়াতে পারে।

কিন্তু পলিথিন ব্যাগ খুবই সহজলভ্য এবং ব্যবহার খুবই সুবিধাজনক বলে ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। পলিথিন ব্যাগের এই সহজলভ্যতা রোধ করতে হবে। আমরা সাধারণত যে পলিথিন ব্যবহার করি, তা অনেক সময়ই ব্যবহার-অযোগ্য অথবা খুবই নি¤œমানের। এ নি¤œমানের পলিথিন উৎপাদন বন্ধ করে মানসম্মত পলিথিন উৎপাদন করলে পলিথিনের মূল্য বেড়ে যাবে। ফলে পলিথিনের সহজলভ্যতা কিছুটা কমবে। তাছাড়া পলিথিনের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করে মূল্য নির্ধারণ করা গেলে বিক্রেতারা বিনা মূল্যে ক্রেতাদের পলিথিনব্যাগ দিতে না পারলে, ক্রেতারাও বেশি মূল্যে পলিথিনব্যাগ কিনতে চাইবে না। এ ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে পলিথিন বিষ না কিনে পাটের থলে ব্যবহার করলে টাকা যেমন বাঁচবে, তেমনি পরিবেশও বাঁচবে, একই সঙ্গে বাঁচবে মানুষ নিজেও। এমন সচেতনতা আপামর সব মানুষের ধারণায় আনতে হবে। পলিথিনব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজের ব্যাগ ও ঠোঙ্গার ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং তা সহজলভ্য করতে হবে। পলিথিন ও প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়সাধন করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, পাট অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড,  এফবিসিসিসিআই, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে, যেন পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা যায়।

পাশাপাশি নারীদেরও এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। কোনো কিছু কিনতে গেলে যত পদের জিনিস ততটা পলিথিনের প্যাকেট না করে সব জিনিস যদি নারীরা একটি পলিথিনব্যাগে করে বাসায় এনে আলাদা করে, তাহলে কিন্তু পলিথিনের ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে। বাজারে যাওয়ার সময় যে বাজার করে, তার হাতে যদি একটা পাটের ব্যাগ বা থলে ধরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলেও পলিথিনের ব্যবহার কিছুটা কমানো সম্ভব। নারীদের এ ক্ষেত্রে সচেতনতা প্রয়োজন। পলিথিনের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা পেতে তরকারি, ফলমূলের খোসা ও বাসাবাড়ির ময়লা আবর্জনা পলিথিনব্যাগে ভরে না ফেলে একটি পাত্রে করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে আসতে হবে, এতে পরিবেশ অনেকটাই রক্ষা পাবে। প্লাস্টিকের কন্টেইনারের পরিবর্তে স্টিলের অথবা কাচের কন্টেইনার ব্যবহার করতে হবে এবং পলিথিন ও প্লাস্টিক কন্টেইনার যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে।

প্লাস্টিক আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে দৈনন্দিন জীবনে আমরা কোনোকিছু বহন করতে ও ধরে রাখতে পলিথিন ব্যাগ ও প্লাস্টিক কন্টেইনারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি ভীষণভাবে। খাদ্যদ্রব্য রাখার জন্য প্লাস্টিক ব্যবহার করা অনুচিত, কিন্তু যেহেতু আমরা প্লাস্টিক কন্টেইনার একেবারেই বাদ দিয়ে চলতে পারি না, তাই আমাদের ভালো মানের প্লাস্টিক ব্যবহার করা উচিত। তাই আমাদের জানা দরকার কোন কন্টেইনার একবার ব্যবহার করা যাবে, কোনটি একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে এবং কোনটি নিরাপদ ও কোনটি নিরাপদ নয়।

আমাদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন ও পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহারসংক্রান্ত আইন থাকলেও এ আইনের তেমন প্রয়োগ নেই। এ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা। পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাত করা বন্ধে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার ব্যাপক নজরদারি থাকতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তৈরি করতে হবে জনসচেতনতা।

অনেক প্লাস্টিক কন্টেইনারের নিচে ত্রিভুজের চিহ্ন থাকে। আমরা এটি লক্ষ্য না করলেও এই চিহ্ন কিন্তু অর্থবহন করে। এই ত্রিভুজের মাঝে ১ থেকে ৭ পর্যন্ত লেখা থাকে। ত্রিভুজের মধ্যে ১ লেখা থাকলে তা একবারের বেশি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক বোঝায়। সাধারণত সাবানের গুঁড়া বা শ্যাম্পুর বোতলে ত্রিভুজের ভেতর ২ লেখা থাকে। ৩ লেখা থাকা বোতল বেশি ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে বলে আশঙ্কা করা হয়। এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ৪ লেখা বোতলটি একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক নিরাপদ। ৫ লেখা কন্টেইনার যথেষ্ট নিরাপদ এবং অনেকবার ব্যবহার করা যেতে পারে। ৬ লেখা কন্টেইনার ব্যবহারে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৭ লেখা কন্টেইনার ব্যবহারের ফলে তা মানবশরীরে হরমোনজনিত সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয় আরও অনেক বেশি।

মোটের ওপর পলিথিন ও প্লাস্টিক কন্টেইনার ব্যবহার বন্ধ করতেই হবে, আর যেখানে সম্ভব নয়, সেখানে উন্নতমানের পলিথিন ও যেসব প্লাস্টিক কন্টেইনারের গায়ে ত্রিভুজের ভেতর ৪ অথবা ৫ লেখা আছে, তেমন মানসম্পন্ন প্লাস্টিকের কন্টেইনার ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের পলিথিনের ক্ষতিকারক দিকগুলো জানিয়ে এর ব্যবহার বন্ধে সচেতন করতে হবে। নিজে সচেতন হতে হবে এবং অন্যদেরও সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যমগুলোকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকভাবে, কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে এবং ব্যবহার বন্ধের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে কেবল এই বিষক্রিয়া থেকে বাঁচাতে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..