মত-বিশ্লেষণ

পশ্চাৎপদ এলাকায় পিছিয়ে বেজা

রুহুল আমিন: পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে আশার আলো জাগিয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজা। ২০১০ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন দ্বারা সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো, আইনের যেসব বিষয়ে এখনও সঠিক মনোযোগ দিতে পারেনি বেজা, তা তুলে ধরা।
শুরুতে বেজার কাজের অগ্রগতি সম্বন্ধে জেনে নিই। সংস্থার হিসাব বলছে, এরই মধ্যে ৮৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি, ২৯ বেসরকারি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে দুটি এবং তিনটি ট্যুরিজম পার্ক রয়েছে। এসব অঞ্চলে বিলিয়ন ডলারের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। বেশকটি অঞ্চলে উৎপাদনও শুরু হয়েছে। এদিকে বিনিয়োগকারীর সেবায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। অনলাইনে ১১ ধরনের সেবা দিচ্ছে বেজা। পাশাপাশি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারও চালু হয়েছে। বেজার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করা, যেখানে এক কোটি কর্মসংস্থান হবে। এসব অঞ্চল থেকে রফতানি আয়ের লক্ষ্য ৪০ বিলিয়ন ডলার।
আইনের ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রফতানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উৎসাহ প্রদানের জন্য পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর এলাকাসহ সম্ভাবনাময় সব এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং তার উন্নয়ন, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন।’ অর্থাৎ পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর এলাকায় অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর এলাকায় অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বেজার সফলতা সীমিত।
সরকারি-বেসরকারি যেসব অঞ্চলে কারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে, তার সবই তুলনামূলকভাবে শিল্পায়িত এলাকায়। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হচ্ছে কুমিল্লার আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপের দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল, বে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রভৃতি। এছাড়া আমান, সিটি, এ কে খান, ইস্ট ওয়েস্ট, বসুন্ধরা, সোনারগাঁও ও কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে তূলনামূলকভাবে শিল্পায়িত এলাকায়। বেসরকারি খাত শুধু কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে।
নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, শেরপুর ও জামালপুরে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি নেই। যেসব সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি ভালো সেগুলো পড়েছে খুলনা, সিলেট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। আর বরিশাল বিভাগে এখনও অর্থনৈতিক অঞ্চল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, উত্তরের পিছিয়ে পড়া জেলা নীলফামারীতে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশেষ অবদান রেখেছে উত্তরা ইপিজেড। এটিও আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগ। সুতরাং উত্তরে উৎপাদনমুখী শিল্পের সম্ভাবনা কম, এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া সরকার এসব জেলায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাইপলাইন বসানোর কাজ শুরু করেছে। আবার এসব জেলা থেকে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
আইনের ৪-এর (খ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘দেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী, গোষ্ঠী, ব্যবসায়িক সংগঠন বা গ্রুপ কর্তৃক একক বা যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল।’ বেজা সরকারি, বেসরকারি, জিটুজি ও পিপিপির ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে, যেখানে দেশি, বিদেশি, ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও গ্রুপ বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বারা এখন পর্যন্ত কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল করার খবর পাওয়া যায়নি। আমরা দেখেছি এরই মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংক করার অনুমতি দেয় সরকার। সেক্ষেত্রে ভালো সাড়াও মেলে।
আইনের ৭-এর ১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলসংশ্লিষ্ট ভূমি এলাকাকে নিম্ন বর্ণিত এলাকায় বিভাজন করিয়া মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করিবার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করিতে পারিবে, যথা: (ক) রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা: রফতানিমুখী শিল্পের জন্য নির্ধারিত; (খ) অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকরণ এলাকা: দেশীয় বাজার চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত শিল্পের জন্য নির্ধারিত; (গ) বাণিজ্যিক এলাকা: ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ওয়্যার হাউজ, অফিস বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত; (ঘ) প্রক্রিয়াকরণমুক্ত এলাকা: আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত।
অর্থাৎ একটি বড় অঞ্চলকে বিভিন্ন ভাগে সজ্জিত করা যেতে পারে। চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এবং ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। এটি সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। এরই মধ্যে এখানে কারখানা নির্মাণ শুরু হয়েছে। কিন্তু ওপরে উল্লেখ করা ধরন অনুযায়ী এ অঞ্চলকে বিভাজন করা হয়নি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একটি হযবরল অবস্থা তৈরি হতে পারে।
আইনের ১৯-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরির মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করিবার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে বা অর্থনৈতিক অঞ্চল-বহির্ভূত স্থানে পশ্চাৎসংযোগ শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।’ সরকারের অন্য বিভাগ, যেমন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিলসহ অনেক বিভাগ দক্ষ শ্রমিক তৈরির কাজটি করছে। কিন্তু বেজার এমন উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি।
আইনের ১৯-এর ১৪ ধারায় বলা হয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে সুষ্ঠু সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য শ্রম বিধিমালা এখনও তৈরি করতে পারেনি বেজা। অর্থাৎ শ্রমিক অধিকার রক্ষায় বেজার উদাসীনতা লক্ষণীয়। অথচ এরই মধ্যে অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও উৎপাদনে হাজারো শ্রমিক নিয়োজিত হয়েছেন। পাশাপাশি শ্রমিক অধিকার রক্ষায় বেজায় এ বিষয়ে দক্ষ লোকের প্রয়োজন আছে।
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, বেজার সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সুশাসনের বড় শর্ত হলো বিকেন্দ্রীকরণ। যেহেতু সারা দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, তাই বেজার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ঢাকা বাদে অন্য বিভাগে আঞ্চলিক কার্যালয় হলে কাজে গতি বাড়বে। সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
তবে বেজার সফলতাও কম নয় জাপানের বিখ্যাত হোন্ডা, সুমিতমো করপোরেশন, অস্ট্রেলিয়ার টিআইসিসহ অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে এদেশে আনতে পেরেছে। ভারত, চীন, জাপানের ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল করার কাজে হাত দিয়েছে। বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশকে যেমন আকর্ষণীয় করে তুলেছে, তেমনি দেশের ব্যবসায়ীদেরও আশা জাগাচ্ছে। এরই মধ্যে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরেই এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
বেজারও মনে রাখা উচিত, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর ছাড়ের বিষয়টি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া চলমান প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে ধারাবাহিকতা রেখেছে সরকার। টানা তিন মেয়াদে এ পদে আছেন সাবেক সচিব পবন চৌধুরী। পাশাপাশি প্রচলিত আমলাতন্ত্রের বাইরে গিয়ে একটি সেবামূলক অফিস প্রতিষ্ঠায় বেজাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল নিয়োগের স্বাধীনতা আছে বেজার।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

সর্বশেষ..