দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

পাঁচতারকা হোটেলের ব্যবসায় ধস

হামিদুর রহমান: করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবে গোটা বিশ্বই পর্যুদস্ত। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম অ্যাভিয়েশন ও পর্যটন খাত। করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিভিন্ন ধরনের সভা-সেমিনার স্থগিত হয়ে যাওয়ায় পর্যটনের প্রধান উপখাত হোটেল ব্যবসা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে অভিজাত পাঁচতারকা হোটেলগুলো বেশি সংকটে পড়েছে, কারণ এসব হোটেলের অতিথিদের সিংহভাগই বিদেশি। কিন্তু গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট সংকুচিত হতে থাকায় পাঁচতারকা হোটেলগুলো অতিথিশূন্য হয়ে পড়েছে। অনেকটা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের।

রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেলে যোগাযোগ করে জানা যায়, দেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর থেকে ব্যাপকহারে অতিথির সংখ্যা কমতে শুরু করে। ফলে চার মাস ধরে অভিজাত এসব হোটেলে অতিথি নেই বললেই চলে। এর মধ্যে গত রমজানের আগ থেকে ঈদের পর প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী  হোটেলগুলো বন্ধ ছিল। বর্তমানে হোটেল খোলা হলেও গেস্ট নেই। এমনকি বিভিন্ন ধরনের ছাড়ের অফার দিয়েও অতিথি মিলছে না, কারণ দেশে বিদেশিদের আনাগোনা নেই বললেই চলে।

বিদেশি অতিথির পাশাপাশি পাঁচতারকা হোটেলগুলোর বাণিজ্যের একটি বড় উৎস বলরুমসহ বিভিন্ন সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও সম্মেলন। এসব সম্মেলনের বড় অংশের আয়োজন করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজিত হয় এসব হোটেলে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও বিভিন্ন ধরনের সিভিল সোসাইটি সংগঠনও নানা ধরনের সভা-সম্মেলন আয়োজন করে। কিন্তু করোনাকালে এগুলোর সবই স্থগিত। চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো ব্যাংক এজিএম আয়োজন করেনি। বড় কোনো করপোরেট গ্রুপও এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেনি। এসব আয়োজন পাঁচতারকা হোটেলগুলোর রাজস্বের অন্যতম প্রধান খাত। এর পাশাপাশি বিদেশি অতিথি না থাকায় হোটেলগুলোর নিজস্ব রেস্তোরাঁ ও বারগুলোর কার্যক্রমও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকি সুইমিংপুল ও ব্যামাগারেও নেই কোনো সমাগম। একমাত্র হোম ডেলিভারি ব্যবসা সচল। সব মিলে তাদের ব্যবসা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

হোটেলসংশ্লিষ্টরা জানান, ‘স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা প্রায় এক-তৃতীয়াংশে বা তারও কমে নেমে এসেছে। বিশেষ অফারেও গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশি অতিথি ছাড়াও আগে মোটামুটি প্রায় সব হোটেলেই সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের সভা-সেমিনার থাকত, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ।’

রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাঁচতারকা হোটেল প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও। স্বাভাবিক সময়ে কারওয়ান বাজারের এ হোটেলটিতে সভা-সেমিনার আয়োজনের জন্য কয়েক মাস আগে বুকিং দিতে হয়। এমনকি অতিথিদের জন্য রুম বুকিং পেতেও বেশ আগে থেকেই বুকিং দেওয়া লাগে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর সে চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, ‘বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা এতটাই নাজুক যে, গত তিন মাসে আমাদের বিদেশি অতিথি এসেছেন হাতেগোনা কয়েকজন। এর বাইরে চীনের একটি প্রতিনিধিদল কিছুদিন ছিল। তাছাড়া আর কোনো অতিথি আসেনি। হোটেল খোলা, কিন্তু অতিথি নেইএমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনও হইনি। প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

জানতে চাইলে হোটেল সোনারগাঁও কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘প্রায় চার মাস ধরে বিদেশি অতিথি নেই বললেই চলে। আপাতত কিছু ফুড ডেলিভারি সেবা চালু আছে। সেগুলোও চলছে সীমিত পরিসরে।’

একই রকম অভিজ্ঞতার করা জানায় হোটেল লা মেরিডিয়ান। হোলেটটির প্রায় বেশিরভাগ সময় মুখরিত থাকে বিদেশি অতিথিদের পদভারে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আর সে অবস্থা নেই। লা মেরিডিয়ান জানায়, ‘সাধারণ ছুটির সময় অনেক দিন হোটেল বন্ধ রাখা হয়েছিল। বর্তমানে সাধারণ ছুটি নেই। ফলে হোটেল চালু করা হয়েছে, কিন্তু অতিথি বা ক্রেতা নেই। করোনার আগের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে বলতে হবে ব্যবসার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। কেবল বাংলাদেশেই যে এমন অবস্থা চলছে তা নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের চিত্রই এখন এমন।’

এদিকে ব্যবসায় ধস নামায় টিকে থাকার তাগিদে কিছু তারকা হোটেল অনলাইন ও মুঠোফোনের মাধ্যমে গ্রাহকদের নানা ধরনের ছাড়ের অফার দিচ্ছে। কিন্তু সে উদ্যোগেও তেমন সাড়া মিলছে না। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল রুমপ্রতি হোটেলটি ১১ হাজার টাকায় ভাড়ার প্রস্তাব করে নিয়মিত গ্রাহকদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠাচ্ছে। দুই রাত অবস্থান করলে এক রাত বিনা মূল্যে অবস্থানের অফারও দিচ্ছে অভিজাত হোটেলটি।

একই রকম স্পেশাল অফার দিচ্ছে আরেক অভিজাত হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। ৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় দুই বেলার খাবারসহ ২৪ ঘণ্টার জন্য রুম ভাড়ার প্রস্তাব দিয়ে নিয়মিত গ্রাহকদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠাচ্ছে হোটেলটি। যদিও স্বাভাবিক সময়ে রুম ভাড়া ও খাবারের জন্য ২০ হাজার টাকার বেশি গুনতে হতো গ্রাহকদের।

কেবল এ কয়েকটি হোটেলই নয়, রাজধানীর আরেক অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্ল–’র চিত্রও একই। এছাড়া অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান ও বনানীতে বেশ কয়েকটি পাঁচতারকা, চারতারকা ও তিনতারকা মানের হোটেল রয়েছে। তাদের ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। এসব হোটেলের মধ্যে রয়েছে লেকশোর, হোটেল আমারি, সিক্স সিজনস, সারিনা প্রভৃতি।

উল্লেখ্য, দেশের সেবা খাতে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। সেবা খাত বলতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, ক্লিনিক, এভিয়েশন, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুরিজমের অন্যসব প্রতিষ্ঠান ও স্পোর্টস-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় দেশের সম্মিলিত ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..