দিনের খবর সারা বাংলা

পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে যশোরের গাঁওঘরার মানুষের

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: যশোর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে গাছগাছালিতে ঘেরা ছোট্ট শান্ত গ্রাম ‘গাঁওঘরা’। গ্রামটি এখন বিভিন্ন জাতের পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দুপুর গড়িয়ে বিকাল নামতেই পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। ভালো পরিবেশ পেয়ে গ্রামটিতে স্থায়ীভাবে বাসা করে ডিম পাড়ছে ও ছানা ফোটাচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির শত শত পাখি। পানকৌড়ি, দাঁড়বক, শামুকখৌল, কাদাখুচা, কয়েক প্রজাতির বক, শালিক, দোয়েল, চড়–ই, টুনটুনি, ঘুঘুসহ বেশ কিছু নাম-না-জানা পাখির আবাসস্থল হয়ে উঠেছে গ্রামটি।

জানা গেছে, গ্রামে গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করা দুষ্টু বালক ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় যাদের খ্যাতি আছে, তারাও এগিয়ে এসেছে পাখি রক্ষায়। আর গ্রামটিকে পাখিদের অভয়াশ্রমে পরিণত করতে গড়ে উঠেছে ‘ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশন’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনের সদস্যদের প্রচেষ্টা, গ্রামের মানুষের সচেতনতা এবং ধর্মীয় নেতাদের সহযোগিতায় গ্রামটিতে প্রতিদিন ভোর হয় আর সন্ধ্যা নামে হাজার হাজার পাখির কলরবে।

গ্রামের পূর্ব পাড়ার দুটি বাগানে পাখিগুলোর কলোনি। বড় বড় তেঁতুল, নিম, মেহগনি ও রেইনট্রি গাছের ডালে ডালে এদের বাসা। প্রতিদিন ভোরে খাবারের সন্ধানে এরা দলবেঁধে উড়ে যায় আশেপাশের জলাশয়ে। আবার সন্ধ্যায় ঝাঁকবেঁধে ফিরে আসে বাসায়। ফেরার সময় ছানাপোনার জন্য মুখে করে আনে খাবার। এছাড়া গ্রামজুড়ে গাছগাছালি ও বাঁশঝাড়ে বসবাস করে হাজারো শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, চড়–ই, ফিঙ্গে, মাছরাঙ্গা, কানাকুয়োসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

জেলা সদরের ইছালী ইউনিয়নের গাঁওঘরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ইউনুস আলী মোল্লা ও মুক্তার আলী মোল্লার বাগানে বড় বড় গাছের ডালে বড় জাতের পাখির বাসা। পাশে মেহগনি গাছের মগডালে দাঁড়িয়ে আছে সদ্য ডানা ঝাপটাতে শেখা কয়েকটি পানকৌড়ির ছানা। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ার পর প্রথমে ফিরল কয়েকটি পানকৌড়ি, তারপর আরও কয়েকটি। এরপর ঝাঁকে ঝাঁকে। কারও মুখে মাছ, গাছের ডালে দাঁড়িয়ে সেই মাছ তারা তুলে দিচ্ছে নবীন পানকৌড়ির মুখে।

আলো আরেকটু কমতেই আসে কয়েকটি বক। তারাও আশ্রয় নিল পাশের একটি বড় গাছের ডালে। একইসঙ্গে সদলবলে এলো শামুখখোল। শত শত এসব পাখির কলোনিতে তখন ডালের দখল নিয়ে ধাক্কাধাক্কি। আর তাদের কলরবে মুখর চারদিক।

কথা হয় ফাঁদ পেতে পাখি শিকারে একসময় খ্যাতি পাওয়া সজীব হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ফাঁদে পাখি মিস হতো না। ঘুঘু, বকসহ কত পাখি শিকার করেছি। তখন বুঝতাম না পাখির উপকারিতা। পাখি মাঠের পোকামাকড় খেয়ে ফেলে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। যারা পাখি শিকার করত তাদের বোঝানো হয়েছে। মসজিদের ইমাম জুম্মার নামাজে পাখি থাকার উপকারিতা বললেন। এখন কেউ আমাদের গ্রামে শিকার করতে এলে তাকে বোঝাই, বাধা দিই।’

গাঁওঘরা বায়তুন নূর জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য পাখি। গ্রামের ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশনের ছেলেরা পাখি রক্ষার অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে আসে। তখন আমি জুম্মার নামাজের খুতবায় পরিবেশ রক্ষায় পাখি থাকার উপকারিতা বর্ণনা করি।’

ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাকিম আহসানুল বলেন, ‘আগে শুধু কয়েকটা ছোট বক থাকত বাগানে। তখন শিকারিদেরও উৎপাত ছিল। দুষ্টু ছেলেরা গুলতি দিয়েও পাখি মারত। জাতীয় পাখি দোয়েলের মতো কিছু পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় আমাদের পাখি রক্ষার ইচ্ছা জাগে। ২০১৬ সালে পাখি হত্যা বন্ধে ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশনের সদস্যরা উদ্যোগ নিই। তখন গ্রামে থাকা কিছু বক, ঘুঘু, শালিক, চড়ুই এগুলো রক্ষায় কাজ শুরু করি। গ্রামবাসীকে পাখির উপকারিতা সম্বন্ধে বোঝাই।’

তিনি বলেন, ‘তার পরও পুরোপুরি বন্ধ করতে না পেরে গ্রামের মসজিদের ইমামের শরণাপন্ন হই। তিনি জুম্মার নামাজের খুতবার সময় পাখি থাকার উপকারিতা বর্ণনা করে বক্তব্য দেন। এতে ভালো কাজ হয়। এখন গ্রামের কেউ পাখিদের কোনো উৎপাত করে না। কয়েক বছর ধরে বকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানকৌড়ি ও শামুকখোল পাখির আগমন শুরু হয়েছে।’

ইচ্ছেঘুড়ি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পাভেল রায়হান বলেন, ‘পাশের গ্রামের প্রভাবশালী কয়েকজন মাঝে এসেছিল এয়ারগান নিয়ে পাখি শিকার করতে। আমাদের কয়েকজন তাদের বুঝিয়ে বলে নিষেধ করে। তার পরও তারা ক্ষমতা দেখিয়ে পাখি শিকারের চেষ্টা করে। তখন আমাদের হাঁকডাকে গ্রামের মানুষ এগিয়ে আসে। এসময় বাধ্য হয়ে পাখি শিকার না করেই তারা ফিরে যায়। পাখি রক্ষায় এখন আমাদের গ্রামের সবাই একজোট।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..