প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক: পুঁজিবাজারের ৩ কোম্পানির রফতানি কমার শঙ্কা

জাকারিয়া পলাশ: ভারতে পাটপণ্য রফতানির ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি কোম্পানি এ শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে। এতে কোম্পানিগুলোর রফতানি আয়ে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে এমনটা ভাবছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে সুনামের সঙ্গেই এসব কোম্পানি মার্কেটে থাকতে পারবে বলে মনে করছেন কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্রমতে, ডাম্পিংয়ের অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য ভারতে রফতানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট অনুসারে পাঁচ বছরের জন্য এ শুল্ক আরোপিত থাকবে। পাটের তৈরি হেসিয়ান ফেব্রিকস (চট), পাটের সুতা ও বস্তার ওপর এসব শুল্ক বসানো হয়েছে। ওই গেজেটে বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে শুল্ক বসানো হচ্ছে। কোম্পানি ও পণ্য অনুসারে ওই শুল্কর পরিমাণ প্রতি টনে সর্বনিম্ন সাড়ে ১৯ ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার পর্যন্ত। অবশ্য হাসান জুট মিলসের বস্তা ও সুতা এবং জনতা জুট মিলসের সুতার ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়নি।

সূত্রমতে, ঢাকার পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত পাট খাতের তিনটি কোম্পানিও এ শুল্ক আরোপের আওতায় এসেছে। কোম্পানি তিনটি হলো: ‘সোনালী আঁশ ট্রেডিং (প্রা.) লিমিটেড’, ‘নর্দার্ন জুট ম্যান্যুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’ ও ‘জুট স্পিনার্স লিমিটেড’। প্রকাশিত গেজেটে নন-স্যাম্পলড এক্সপোর্টার্স ক্যাটাগরিতে মোট ১৪টি কোম্পানির মধ্যে রাখা হয়েছে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানও। এ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর প্রস্তুত করা পাটসুতার ওপর টনপ্রতি ৯১ দশমিক ১৯ ডলার, চটের ওপর ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার এবং বস্তার ওপর ১২৫ দশমিক ২১ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানো হয়েছে।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুধু স্পিনিং (সুতা তৈরি) খাতের প্রায় অর্ধশত কোম্পানির রফতানি ছিল ভারতে। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানির শতভাগ পণ্যের রফতানি ছিল ভারতে। ওই তিনটি কোম্পানি হলোÑট্রান্স ওশান ফাইবার্স প্রসেসরস, লক্ষ্মণ জুট মিলস ও প্রাইড জুট মিলস। এছাড়া চারটি কোম্পানির রফতানির ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি যাচ্ছিল ভারতে। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে নর্দার্ন জুট মিলসের সর্বাধিক ৭২ শতাংশ পণ্য ভারতে রফতানি হচ্ছিল। ওই পণ্যের ওপর টনপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৭ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানো হয়েছে। সোনালী আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজের পণ্যের প্রায় অর্ধেক (৪৭ শতাংশ) রফতানির গন্তব্য ছিল ভারত। তার ওপর টনপ্রতি ২০ দশমিক ৩৫ ডলার শুল্ক বসানো হয়েছে। আর জুট স্পিনার্স লিমিটেডের রফতানির ২৯ শতাংশ যায় ভারতে। এর ওপর শুল্কর পরিমাণ টনপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৭ ডলার। ফলে ভারতের বাজারে কোম্পানিগুলোর পণ্যের রফতানি ব্যয় এক থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। কমবে এদের বৈদেশিক মুদ্রায় অর্জিত মুনাফা।

এদিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রায় সম্পূর্ণই রফতানিনির্ভর। দেশে তাদের বাজার নেই বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে নর্দার্ন জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনঙ্গ মোহন রায় শেয়ার বিজকে বলেন, পাটপণ্যের দেশীয় কোনো বাজার আমাদের নেই। শতভাগ রফতানিনির্ভর প্রতিষ্ঠান নর্দার্ন। আমরা ভারতের বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছিলাম। ফলে আমরা দেশটির প্রতি একটু বেশি ঝুঁকে পড়েছিলাম। এখন আমাদেরকে দু-এক মাস পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরই মধ্যে অন্য বাজার খোঁজা শুরু হয়েছে।

চীন, শ্রীলঙ্কা, ইরান ও রাশিয়ায়ও বাজার নর্দার্ন জুটের সুতা রফতানি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদেরকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। কিন্তু অন্যান্য দেশে বাজার প্রসারিত করার দিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।

তথ্যমতে, সোনালী আঁশ ১৯৮৫ সালে তালিকাভুক্ত হয়। লোকসান থেকে সর্বশেষ অর্থবছরে মুনাফায় ফেরা ওই কোম্পানির মোট ২৭ লাখ ১২ হাজার শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৬১ দশমিক ৯৯ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩২ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গতকাল কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ২০৫ টাকা ৩০ পয়সায় লেনদেন হয়।

লোকসানে থাকা অন্য কোম্পানি জুট স্পিনার্স তালিকাভুক্ত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ পরিচালকদের হাতে রয়েছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ৩৭ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৩ দশমিক ১১ শতাংশ রয়েছে। এদিকে গতকাল ওই কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার ৫৯ টাকায় লেনদেন হয়।

১৯৯৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় নামমাত্র মুনাফা করা কোম্পানি নর্দার্ন জুট। আইন লঙ্ঘনের কারণে কোম্পানিটিকে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানো হয়েছিল। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি মূল মার্কেটে ফিরে আসে। কোম্পানিটির এক কোটি ৭৮ লাখ পাঁচ হাজার শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এদিকে গতকাল ওই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ার ২৫৬ টাকা ৭০ পয়সায় লেনদেন হয়।

অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ পুঁজিবাজারে কোম্পানির শেয়ার দরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না আশা প্রকাশ করে আনঙ্গ মোহন রায় বলেন, ‘আমাদের কোম্পানি ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করছে। তাছাড়া শিপমেন্ট, মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। আর আমরা বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে, সাময়িক এ সংকট পুঁজিবাজারে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’