প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক হচ্ছে আরও ৯ পণ্যে

নাজমুল হুসাইন: পাটের ব্যবহার বাড়াতে ২০১০ সালে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন’ করা হয়। এতে ছয় পণ্য সরবরাহ ও বিপণনে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। ওই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে আরও ৯টি নতুন পণ্য। সম্ভাব্য পণ্যগুলো হলো: মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, হলুদ, আলু এবং তুষ ও কুঁড়া।

সম্প্রতি ১৩টি পণ্যের নতুন করে পাটজাত মোড়ক বাধ্যতামূলক করতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে পাট অধিদফতর। তবে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সভায় বাদ দেওয়া হয় চারটি পণ্য। অনুমোদন না পাওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আটা, ময়দা, পোলট্রি ফিড ও ফিশ ফিড। বাকি ৯ পণ্যে পাটজাত মোড়ক বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য (ভেটিং) আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে পাট অধিদফতরের পরিচালক (পাট) আবদুল জলিল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইনে বলা রয়েছে, ধারাবাহিকভাবে এই আইনের আওতায় সব পণ্য আসবে। তারই অংশ হিসেবে ৯ পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’

পাট অধিদফতরের এ কর্মকর্তা জানান, নতুন করে ১৩ পণ্যে পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক চেয়েছিল অধিদফতর। তবে মন্ত্রণালয় ফিশ ফিড, পোলট্রি ফিড, আটা ও ময়দার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে বাদ দিয়েছে। পাটের বস্তা ব্যবহারের বিষয়ে কারিগরি কমিটির সুপারিশগুলো উপদেষ্টা কমিটি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করেছিল। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে ৯ পণ্যে অনুমোদন দিয়ে সিদ্ধান্তটি দেওয়া হয়।

পাট খাতকে সহায়তা করতে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে বাধ্য করে ২০১০ সালে আইন প্রণয়ন করে সরকার। ওই আইনে কিছুটা সংশোধন আনা হয় ২০১৩ সালে। কিন্তু তা কার্যকর করতে ব্যবসায়ীরা কয়েক দফা সময় নেন। এরপর গত বছর চূড়ান্ত গেজেটের মাধ্যমে তা কার্যকর হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নের দিকে খুব একটা এগোয়নি। এতে শেষ গত বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে প্রায় নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন বাজারে অভিযানে চালাচ্ছে সরকার। বর্তমানে কার্যকর আইনে দেশে চাল, ধান, গম, ভুট্টা, চিনি ও সার এ ছয়টি পণ্যের মোড়ককরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

একইভাবে আইন না মানলে কারা ও অর্থদণ্ডসহ ব্যাংকঋণ সুবিধা বন্ধ, লাইসেন্স বাতিল, আমদানি-রফতানি সনদ বাতিলের বিধান করা হয়েছে। আইনটির ১৪ ধারা অনুসারে পাটের মোড়ক ব্যবহার না করলে অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এ অপরাধ পুনঃসংঘটিত হলে সর্বোচ্চ দণ্ডের দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

নতুন পণ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত হলে পাট অধিদফতরের হিসাবে, পণ্যগুলোর ৫০ কেজি হিসেবে মোড়কজাতকরণের জন্য ওইসব পণ্যের পাটের বস্তার চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৩০ কোটি পিস। সমপরিমাণ বস্তা উৎপাদনে কাঁচা পাটের চাহিদা বাড়বে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার বেল।

ব্যবসায়ীদের মতে, ওই পরিমাণ বস্তা উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এমনটি মনে করে না বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। তদের হিসাবে, আগে কার্যকর ছয়টি পণ্য মোড়ককরণ করতে বছরে ৫০-৫৫ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এতটা ব্যবহার হয় না। কারণ আইনের সম্পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে আরও প্রায় ৩০ কোটি পিস বস্তার চাহিদা হতে পারে। তবে তা সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে বিজেএমসি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) বছরে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি পাটের বস্তা তৈরির ক্ষমতা আছে। প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু ব্যবহার নেই বলে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি বস্তা।

জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বিজেএমসি একাই ৪০ কোটি বস্তা উৎপাদন করতে পারবে। ইতোমধ্যে যেসব পণ্যে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়েছে, তাও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। এতে তার অর্ধেকই বিক্রি করা যাচ্ছে না। তাই বিজেএমসির সক্ষমতায় অর্ধেক উৎপাদন করতে হচ্ছে। আর নতুন পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলেও সমস্যা হবে না।

এদিকে পাটের বস্তা ব্যবহারে কয়েকটি কারণেই ব্যবসায়ীদের অনীহা রয়েছে। সেজন্য গত বছর থেকে প্রায়ই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে সরকার। গতকালও বগুড়া জেলার শাজাহানপুর ও শেরপুর উপজেলায় চারটি অটোরাইস মিলে আলাদা অভিযানে পাটজাত পণ্য ব্যবহার না করায় তিন লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকার পাঁচ ব্যবসায়ীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

কেন পাটের বস্তায় পণ্য বিপণন করতে চান না ‘এমনটি জানতে চাইলে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, প্লাস্টিকের বস্তা অনেক সহজলভ্য। আর পাটের বস্তার দাম বেশি। দেশি চাহিদা

মেটাতে তৈরি হওয়া পাটের বস্তার দাম ৪০-৪৫ টাকা। অন্যদিকে বাজারে একই

ওজন বহনে সক্ষম প্লাস্টিকের বস্তা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় ১৫-২০ টাকায়। সে কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে প্লাস্টিকের বস্তা বেশ জনপ্রিয়। সরকারকেও এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে নতুন নতুন পণ্য পাটের ব্যাগের আওতাভুক্ত করতে হবে বলে দাবি জানায় ব্যবসায়ীদের একাধিক সংগঠন।