প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পানির অভাবে কৃষকের পাট জাগ দেয়া নিয়ে শঙ্কা

প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ: এ বছর পাটের ভালো ফলন হলেও বৃষ্টি না থাকায় পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারছেন না গোপালগঞ্জের কৃষকরা। জাগের উপযুক্ত পরিবেশ না হলে ভালো পাটের আঁশ মেলে না। আঁশ সুন্দর না হলে পাটের ভালো দামও মেলে না। এমন পরিস্থিতিতে পাট নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন জেলার কৃষকরা।

জেলার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে জানা যায়, গোপালগঞ্জে মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের বেশি ফলন পায় কৃষকরা। জমি থেকে পাট কেটে বাড়ির উঠান, সড়কের দুই পাশে স্তূপ করে রেখেছেন কৃষকরা। কিন্তু পাট কাটার এ সময়ে ভরা বর্ষা মৌসুম থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টি না থাকায় খাল-বিল আর ডোবা-নালায় দেখা দিয়েছে পানি শূন্যতা। ফলে কৃষকরা পাট পচাতে পারছেন না। এক পুকুরে অধিক পাট পচানোর ফলে আঁশের রং কালো হয়ে যাওয়ায় কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।

বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এ বছর বাজারে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ টাকায়। কিন্তু পাটের রং কালো হয়ে গুণগত মান নষ্ট হলে দাম কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পাট ব্যবসায়ীরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ২৬ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তোষা পাট ২৫ হাজার ৪১৯ হেক্টর, মেস্তা পাট ৫৮৬ হেক্টর ও দেশি পাট ১০৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। পাটের জাতের মধ্যে রয়েছে সিভিএল-১, ডি-১৫৪, ও-৭২, ও-৯৮৯৭, ইন্ডিয়ান বঙ্কিম, মহারাষ্ট্র, জেআরও-৫২৪, রবি-১, কেনাফ ও এফ-২৪। প্রতি হেক্টরে দুই দশমিক চার মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হবে। সে হিসেবে জেলায় পাট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৬৬৪ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে জেলার ৪০ শতাংশ পাট ক্ষেত থেকে কাটা হয়েছে। বাজারে পাটের দাম ভালো। তাই এ পাট প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক সুরেশ মালাকার (৫৬) বলেন, পাটের ভালো দাম পেয়ে আমি খুশি। এ বছর প্রথমেই পাটের বাজার ভালো পেয়ে আমরা লাভবান। তবে পানি সংকটের কারণে জমি থেকে পাট কেটে অন্যত্র জাগ দিতে হয়েছে। এতে আমার খরচ বেড়েছে। অন্যান্য বছর ১ হেক্টর জমিতে পাট চাষে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হতো। এ বছর ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা গ্রামের রবিউল শেখ (৪৫) বলেন, খালে পানি নেই। তাই পাট জাগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পানি পচে গেছে। পচা পানিতে পাট জাগ দেয়ায় পাটের রং ভালো হচ্ছে না। পাটের রং ভালো না হওয়ায় বেশি দামে পাট বিক্রি করতে পারছি না।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার তারাইল গ্রামের হাসান মোল্যা (৫০) বলেন, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই খালবিলে পর্যাপ্ত পানি নেই। আমাদের উঁচু জমিতে বেশি পাট হয়। এ পাট কেটে নিচু এলাকার খালবিলে জাগ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে।

মুকসুদপুর উপজেলা সদরের পাট ব্যবসায়ী মো. আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, কোরবানির ঈদের আগেই হাটবাজারে নতুন পাট আসতে শুরু করে। তখন প্রতিমণ পাট ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছিল। ঈদের পর পাটকলগুলো পাট কিনতে শুরু করে। তারপর থেকেই পাটের দাম বাড়তে শুরু করে। মুকসুদপুরের হাটে প্রতিমণ পাট ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাটের বাজারে এখন তেজিভাব বিরাজ করছে। জুটমিলগুলো এভাবে পাট কেনা অব্যাহত রাখলে পাটের বাজার আরও বাড়তে পারে বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।

মুকসুদপুর উপজেলা সদরের অপর পাট ব্যবসায়ী শ্যামল কুন্ডু বলেন, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চলে বেশ কিছু জুট মিল গড়ে উঠেছে। এরা প্রতিযোগিতা করে পাট কিনতে মাঠে নেমেছে। এ কারণে পাটের দাম বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরে পাটের বাজার ভালো রয়েছে।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, এ বছর পাট চাষের অনুকূল পরিবেশ ছিল। তাই গোপালগঞ্জে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। পানির অভাবে পাট জাগ দিতে কৃষকদের সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় জেলার সব সøুইস গেট খুলে দেয়া হয়েছে।