প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পানির দরে বিক্রি হচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষকদের স্বপ্ন

রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের চরাঞ্চলে এবার ব্যাপকহারে শীতকালীন বিভিন্ন সবজির চাষবাদ হচ্ছে। সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেষা হওয়ায় এখানকার চরাঞ্চলে শীতকালীন সবজিসহ বছরের নানা সময়ে চাষ হয়- টমেটো, লালশাক, ফুলকপি-বাঁধাকপি, দেশীয় ছোট-বড় বেগুন, কাঁচামরিচ, সিম,লাউসহ হরেক রকমের সবজি। তাই এই চরাঞ্চলকে বলা হয়ে থাকে ময়মনসিংহ জেলার সবজিভাণ্ডার। এখানকার উৎপাদিত সবধরনের সবজি পাইকারদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়।

একদিকে সবজির কম দাম, অন্যদিকে গ্রামীণ রাস্তার বেহালদশায় দিশেহারা এখানকার কৃষকরা। সামান্য লাভে কৃষকরা পাইকারদের কাছে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার সুযোগে, পাইকাররা সেই সবজিগুলো বাজারে বিক্রি করছে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি দামে। এর ফলে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্রেতারা, ঠিক তেমনি সিন্ডিকেটের জন্য কৃষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। অপরদিকে পানির দামে সবজি কিনে লাভবান হচ্ছে অসাধু পাইকাররা। সরেজমিনে চরাঞ্চলের পরাণগঞ্জের বোরোরচর, চর সিরতা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে এই করুণচিত্র।

সরেজমিনে চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিভিন্ন সবজির ক্ষেত, চোখের দৃষ্টি যত দূর যায় তার পুরো এলাকা জুড়েই কেবল সবজি আর সবজি। সকাল থেকেই বিকেল পর্যন্ত কৃষকদের কেউ কেউ ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ সবজি তুলে খাঁচায় ভরার কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন।

ময়মনসিংহের চরাঞ্চলে সবজির মাচা। ছবি: শেয়ার বিজ।

কাজের ফাঁকে কথা হয় চরখরিচা গ্রামের কৃষক শামসুল হকের সাথে। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, ১৮০ শতাংশ জমিতে ৩৫ হাজার টাকার বেশী খরচ করে বেগুন, টমেটো, কাঁচামরিচ চাষ করেছি। প্রায় সবগুলো সবজি ৬৫ হাজার টাকা বিক্রি করেছি। আরও কিছু সবজি ক্ষেতে রয়েছে। এতে লাভ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে কয়েকমাসে আমি যে টাকা লাভ করেছি, তার চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি দামে পাইকাররা বাজারে নিয়ে বিক্রি করছে।

পরানগঞ্জের বীর বাওলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মোতালেব শেয়ার বিজকে বলেন, চল্লিশ বছর যাবত কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছি। অথচ নিজের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন করতে পারিনি। কাকডাকা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সবজি ক্ষেতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছি। ভোর পাঁচটা থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা ক্ষেত থেকে টাটকা সবজি নিতে ভীড় করেন। ফসল বিক্রি করে যা টাকা আয় হয়, তা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সংসারের খরচসহ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েই শেষ। ভবিষ্যতের জন্য একটি টাকাও আয় করতে পারিনা।

বোরোরচরের কৃষক আবুল মিয়া বলেন, পাইকাররা সিন্ডিকেট করে সবধরনের সবজির দাম নিয়ন্ত্রণ করে। ভোরে গাড়ি নিয়ে সবজি ক্ষেতে চলে আসেন পাইকাররা। বর্তমানে আমরা একটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৪ থেকে ৫ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি করছি। পাইকাররা সেগুলো কিনে নিয়ে বাজারে বিক্রি করেন ২০ থেকে ৩০ টাকা পিস। তারা প্রচুর সবজি একসাথে কিনে নেন। এ হিসেবে শ্রমিকসহ যাতায়াত খরচ যতই হোক, পিস প্রতি এত টাকা পার্থক্য হবার কথা না। ঠিক এভাবেই সবধরনের সবজি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে তাদের জাতাঁকলে পিষ্ট হতে হচ্ছে আমাদের এই চরাঞ্চলের কৃষকদের।

বোরোরচর ইউনিয়নের আরেক চাষী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, এবার ১ একর ২০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। মোটামুটি ভালো টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর টমেটো গাছের ব্যাপক মরক ছিল। অনেক টাকার ক্ষতি হয়েছে। এবছর টমেটোর দাম অনেক কম কিভাবে খরচ ওঠাবো তা নিয়ে চিন্তায় আছি।

চরের জমি এখন সবজির চারণভূমি। ছবি: শেয়ার বিজ।

শাহবাজার এলাকার কৃষক মাহতাব উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কৃষকরা কি হালে আছে কখনো খোঁজ নেয়না কৃষি কর্মকর্তারা। সরকারিভাবে কোনো ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়না। আমরা বীজ কেনার সময় দোকান থেকেই বপনের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে থাকি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন রোগে ফসল মরে যায়। তবুও নিজের বুদ্ধি ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে কষ্টের ফসল উৎপাদন করি। কৃষি কর্মকর্তারা যদি মাঠে এসে দিকনির্দেশনা দিত, তাহলে হয়ত আরও বেশি সবজি উৎপাদন সম্ভব হত।

সবজির দাম প্রসঙ্গে সদর উপজেলা কৃষি অফিসার তাহমিনা ইয়াসমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র নদের কোলঘেঁষে তৈরি হয়েছে বিশাল সবজি হাব বা কেন্দ্র। গত বছর তিন হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। এবার আরও বেশি জায়গাজুড়ে সবজি চাষ হচ্ছে। শুধুমাত্র বোরোর চর ইউনিয়নে কাঁচামরিচই চাষ হয়েছে ৪২০ হেক্টর জমিতে। প্রাথমিকভাবে এখানকার কাঁচামরিচ দেশ ছাড়িয়ে যাবে মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপেও। এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের কিছু লোকজন এসে এলাকা ভিজিট করে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইতোমধ্যে ৬০ জনেরও বেশি কৃষককে নিয়ে তিনটি রপ্তানিকারক টিম করা হয়েছে। সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুডটস, ভেজিটেবলস এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এ নিয়ে বেশ অগ্রসরও প্রকাশ করেছে। কৃষকদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন হলে রপ্তানি হবে। এতে করে ন্যায্য দাম পেয়ে কৃষকরা লাভবান হবে বলে আমি আশাকরি।’

এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মতিউজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘শীতকালে বেশি সবজি উৎপাদন হওয়ায় দামও কিছুটা কম থাকে। কৃষকরা একসাথে টাকা পেতে খুব কম দামে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। মূলত এ সুযোগেই অসাধু পাইকাররা সিন্ডিকেট করে কম দামে সবজি কিনে আবার চরা দামে বিভিন্ন সবজি বিক্রি করেন। তাছাড়া আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সবধরনের পরামর্শ ও বিভিন্ন সময় কৃষকদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। ফলে অনেক বেশি পরিমাণ জমিতে কৃষক সবজি চাষাবাদ করতে পারছে এবং তারা লাভবানও হচ্ছেন।’