Print Date & Time : 2 July 2022 Saturday 10:34 am

পানি এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্তমানে পানিকে শুধু সম্পদ নয় বরং একটি কৌশলগত সম্পদ হিসাবে দেখা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় নদী ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, ভূ-রাজনীতি হলো রাজনৈতিক মতামত ও জাতীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করার একটি হাতিয়ার।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘তিস্তা নদী অববাহিকা: সংকট উত্তরণ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সপ্তম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সভাপতির বক্তব্যে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরিয়াল ফেলো শহীদুল হক এ কথা বলেন। ভূরাজনীতিকে শুধু একক লাভের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভূ-রাজনীতিকে উভয়ের জন্য লাভবান দৃষ্টিতে দেখতে হবে বলে মত দেন তিনি।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন বিষয়ভিত্তিক প্রসঙ্গ তিস্তা নদীর অববাহিকায় কাঠামোগত হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও তিস্তা নদীর অববাহিকা, বাস্তুতন্ত্র এবং লৈঙ্গিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

নদীর ওপর বাঁধ ইকোসিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানান সম্মেলনে উপস্থিত সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু। সম্মেলনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও এনভায়রনমেন্ট গভার্নড ইন্টিগ্রেটেড অর্গানাইজেশনের পরিচালক জয়ন্ত বসু ‘জিওপলিটিক্স অব রিভার তিস্তা অ্যান্ড নিড টু পারসু ন্যাচারাল বেইজড নেগোশিয়েটেড এপ্রোচ (এনবিএনএ)’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।

তার গবেষণাপত্র থেকে উঠে আসে, দক্ষিণ এশীয় আন্তঃদেশীয় নদীর সমস্যাগুলো আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কারণ এ অঞ্চলের সব দেশ প্রধানত কৃষি, জলবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য কারণে নদীর ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। এ অঞ্চলে অসম রাজনৈতিক ক্ষমতার উপস্থিতি; আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

আন্তঃদেশীয় নদীর পানি ব্যবহারের সমন্বিত মডেল বাস্তবায়নের জন্য আন্তঃদেশীয় স্টেকহোল্ডার পর্যায়ে আলোচনার আহ্বান জানান জয়ন্ত বসু। তিনি বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো সামগ্রিক অববাহিকাভিত্তিক পদ্ধতি নেই; যদিও উভয় দেশের মধ্য দিয়ে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী বয়ে গেছে। এ জন্য একটি সামগ্রিক অববাহিকাভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান বলেন, বাঁধ ও পানি ধারণ করে পানিপ্রবাহ সীমিত করলে নদীভিত্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাহত হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ ভাগ্যবান যে উভয় অঞ্চলে ভালো সুশীল সমাজ সংস্থা রয়েছে, যারা তিস্তা নদীর পানির মতো যে কোনো বিরোধপূর্ণ সমস্যা সমাধান করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।

নদীকে জীবন্ত সত্তা উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এ মূল্য একেবারেই হারিয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আলোচনা প্রক্রিয়ায় প্রকৃতিভিত্তিক আলোচনার পদ্ধতি অনুপস্থিত। পানি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টনের বিষয়ে আলোচনার প্রক্রিয়াটি জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ হওয়া উচিত।’

নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুইবার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন এবং এর কোনো ফলপ্রসূ পরিণতি লক্ষ করা যায় না বলে জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল। তিনি বলেন, ‘গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মধ্যে নদী ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে দেখা উচিত এবং এ অঞ্চলের পাঁচটি নদীপ্রধান দেশকে একসঙ্গে বসে এই তিনটি নদীকে পরিচালনা করা উচিত। কারণ এটি একক নদী ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ২৫টি নদীর সঙ্গে তিস্তা নদীর সম্পর্ক আছে উল্লেখ করে রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা পাড়ের মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে তিস্তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে না। তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটি নদীর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছ। নদী নিয়ে যে কোনো মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে গেলে নদীপাড়ের মানুষ ও পরিবেশের কথা চিন্তা করে দেশীয়ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।’

সম্মেলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক জেরিন ইয়াসমিন চৈতির উপস্থাপিত গবেষণাপত্র ‘লিভিং উইথ তিস্তা রিভার: উইমেনস লাইভলিহুড স্ট্র্যাটেজি ইন দ্য চ্যাঞ্জিং ক্লাইমেট অব দ্য তিস্তা রিভার বেসিন’ থেকে উঠে আসে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নদীর সঙ্গে নারীর একটি দৃঢ় ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। জেরিন ইয়াসমিন বলেন, তিস্তা নদীর অববাহিকায় বসবাসরত নারীরা নতুন চাষ পদ্ধতি, বিকল্প জীবিকার কৌশল এবং দুর্যোগের প্রস্তুতিতে নিয়োজিত হচ্ছেন, যা তাদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করছে। তিনি আরও বলেন, নারীরা এখন আর দুর্বল ও অসহায় নন বরং পরিবারের জন্য নারীরা ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেছেন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন। তারা এখন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড এবং অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত।

এছাড়া নেপালের আইএসইটির উপদেষ্টা অজয় দীক্ষিত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী, গল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক মিনকেট লেপচা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. মাহবুবা নাসরীন এবং গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর শাহনাজ পারভিন সম্মেলনে বক্তব্য দেন।

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্টাল ইনিশিয়েটিভের (বিওয়াইইআই) বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস কো-অর্ডিনেটর জেহরিন আহমেদ এফেক্টেড সিটিজেন অব তিস্তা (এসিটি) তিস্তা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পানি সম্পদের গুরুত্ব, পানির ন্যায্যতা এবং নদীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। একই সঙ্গে পানিসম্পদ ও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের চিন্তার প্রসার করা, পানি নিয়ে বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটানো, বিভিন্ন ধরনের সংলাপকে উৎসাহিত করা, পানি নিয়ে একত্রে কাজ করতে জোট গঠন, আন্তঃসীমান্ত কার্যক্রমে উৎসাহ প্রদান প্রভৃতি উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই ২০১৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন আয়োজন করে আসছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর তিস্তা নদীর অববাহিকায় বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়।