পানি সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের করণীয়

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। পানি আমাদের বাস্তুসংস্থানের একটি অন্যতম উপাদান। পানির সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক? গভীর। মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে এই পানিকে ঘিরেই। শুধু কি সভ্যতা পৃথিবীর সব সমুদ্র বন্দর, অর্থনৈতিক বাণিজ্য, শহর, কৃষিকাজ, শিল্প এবং জ্বালানিসহ সব কিছু পানির ওপর নির্ভরশীল।

পৃথিবীতে ৪৫টির মতো দেশ রয়েছে, যাদের নিজস্ব সমুদ্র বন্দর বা নদী নেই। এই স্থলবেষ্টিত দেশগুলোয় সুপেয় পানির পাশাপাশি রয়েছে জলপথের তীব্র সংকট। রাজধানী ঢাকা এ সংকট থেকে মুক্ত নয়। পৃথিবীর মোট পানির ৯৭.৫ শতাংশ পান করার অযোগ্য। মিষ্টি পানির পরিমাণ মাত্র আড়াই শতাংশ তার মধ্যে ০.৩ ভাগ পানি থাকে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুরে। পৃথিবীতে এত পানি থাকতেও পানি যেন আমাদের জন্য ক্রমেই দুর্লভ ও ব্যয়বহুল  হয়ে উঠছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মরক্কোর নারীরা প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে পানি সংগ্রহ করে চাহিদা পূরণ করছে। সেখানে কুয়াশাকে কাজে লাগিয়ে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে শুকিয়ে আসছে ফোরাত নদী, আড়ল হ্রদ এবং চাঁদ হ্রদ। একদিকে সুপেয় পানি কমে আসছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চাহিদা বাড়ছে। ইউনেস্কো ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, সংরক্ষণ ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন না এলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৫৭০ কোটি মানুষ পানি সংকটে পড়বে।

ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বে পানি সংকট সমাধান না করতে ব্যর্থ হলে সুপেয় পানির জন্য তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ বাধার আশঙ্কা রয়েছে। ইউনিসেপের এক প্রতিবেদনে বলেছে, নদীমাতৃক দেশ বলে খ্যাত বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ, সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছে। সুপেয় পানি হতে বঞ্চিত তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। পরিবেশবাদী সংগঠন বাপা গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় পানির স্তর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭০ ফুট নিচে নেমে গেছে। রাজশাহীতে ১৮ থেকে ১৯ ফুট। মহানগরীতে ২ কোটি লোকের বসবাস এবং চাহিদামতো প্রতিদিন প্রায় ২৩৫ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন কিন্তু চাহিদা অনুসারে তা উৎপাদন হচ্ছে না। প্রতিদিন ঢাকা মহানগরে ২০০০ জনসংখ্যা যোগ হচ্ছে। যে কারণে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গড়ে একজন মানুষ প্রতিদিন ২ থেকে ৪ লিটার পানি পান করে। প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার ছাড়াও ঢাকা শহরে প্রায় ৩০ কোটি লিটার পানি অপচয় করা হয়। ফলে ভাটির দেশ বাংলাদেশে অসংখ্য নদী পানির অভাবে মারা গেছে। অন্যদিকে রাজধানীর চারপাশে থাকা বড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, তুরাগ, বালু চারটি নদীই দূষণ ও দখলের শিকার। দেশে নব্বই

দশকে ৮০ শতাংশ সেচের উৎস ছিল নদ-নদী, যা বর্তমানে ২০ শতাংশ এসে দাঁড়িয়েছে।

পানি সংকট নিরসনে রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ এবং অপচয় রোধ জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজš§কে পানি সংকট হুমকি থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। প্রত্যেককে নিজ অবস্থান থেকে পানি অপচয় রোধে এগিয়ে আসতে হবে।

মাহমুদা আক্তার টুকুমনি

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..