পানের দরপতনে দিশাহারা রাজশাহীর চাষিরা

মেহেদী হাসান, রাজশাহী: পানের ক্রমাগত দরপতনে দিশাহারা রাজশাহীর চাষিরা। বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে কয়েকগুণ লোকসানে তাদের পান বিক্রি করতে হয়েছে। তবে গত বছর শেষের দিকে পানের দাম বাড়তে শুরু করলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয় তারা। কিন্তু ফের কমতে শুরু করেছে পানের দাম।

কৃষকরা বলছেন, কভিডের কারণে টানা ছয় মাস লকডাউন থাকায় কয়েকগুণ কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে গত বছর। বন্যায় পান বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে পানের বরজে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে কমেছে দাম। আশানুরূপ রপ্তানিও হয়নি। এসব কারণে পানের চাহিদা নাই বাজারে। গত বছর একই সময় বড় পানের বিড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ছোট পান ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গতকাল রাজশাহীর মোহনপুর একদিল তলা পানের হাট ঘুরে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

জেলায় উৎপাদিত পানের একটি বড় অংশ যেত বিদেশে। পানে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের কারণে বর্তমানে রপ্তানি বন্ধ। এ কারণে পানের দরপতন হয়েছে। বর্তমানে দাম কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছর রাজশাহীতে চার হাজার ৪৯৯ দশমিক ২৩ হেক্টর জমিতে পান উৎপাদন হয়েছে ৭৬ হাজার ১৫২ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ১৭ মেট্রিক টন। উৎপাদিত পানের এক হাজার ১৭১ মেট্রিক টন বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। রাজশাহীতে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি পান বেচাকেনা হয়। এখানকার ৭২ হাজার ৭৬৪ কৃষক পান চাষাবাদে জড়িত। জেলার

মোহনপুর, দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পান চাষ হয়। এর মধ্যে বাগমারা উপজেলায় উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। চলতি মৌসুমে বাগমারায় এক হাজার ৫৬০, দুর্গাপুরে এক হাজার ৪১০ ও মোহনপুরে এক হাজার ১৮২ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছে।

মোহনপুরের বাকশিমইল গ্রামের পানচাষি আশরাফ আলী বলেন, ১৫ কাঠা জমিতে পানের বরজ করেছি। বর্তমানে পানের রোগ দেখা গিয়েছে। শীত এলে গাছের গোড়ায় পচন ধরে, পাতা পেকে যায়, পাতা নষ্ট হয়ে যায়। একদিকে উৎপাদন কমেছে অন্যদিকে দাম পড়ে গেছে। আমরা কৃষকরা মহাসংকটে আছি। যে পানের পোয়া (৩২ বিড়ায় এক পোয়া) তিন হাজার টাকা বিক্রি হওয়ার কথা সেই পান বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকায়। অর্ধেকেরও কম। আমরা যাব কোথায়?

কৃষক উমর আলী বলেন, ১০ কাঠা জমিতে পানের বরজ করেছি। পানের উৎপাদন কমে গেছে। আগে যে পান বিক্রি হতো ৫০ থেকে ৬০ টাকা বিড়া। সেই পান এখন ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমানে পানের দামে গাড়ি ভাড়া আর শ্রমিকের মজুরি হচ্ছে না।

পানের পাইকারি বিক্রেতা সাইদুর রহমান জানান, লকডাউনে পানের বাজার খুবই কম ছিল। গত এক বছর পানের বাজার ওঠানামা করেছে। ছোট পানের পোয়া আগে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতো। সেই পান এখন ৪৫০ টাকা। আবার বড় পানের পোয়া ৩০০০ টাকায় বিক্রি হতো সেই পান এখন ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা।

একদিলতলা পানের হাট কমিটির পরিচালক হারুন-অর-রশিদ জানান, কভিডের কারণে টানা ছয় মাস লকডাউনে থাকায় দেশের বিভিন্ন শহরসহ বিদেশে পান রপ্তানি বন্ধ ছিল। এর মাঝে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় পুরোদমে পান বেঁচাকেনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আবার পানের দাম নাই। কৃষকরা বিপদে আছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল শেয়ার বিজকে বলেন, রাজশাহীর পান রপ্তানি হওয়ায় কৃষকরা বেশ লাভবান হন। বর্তমানে পানের দাম কিছুটা কম। শীতকালে পানের উৎপাদন কমে যায় কিছু রোগের কারণে। কৃষকদের আরও সতর্ক হতে হবে।

রোগ-বালাই বিষয়ে তিনি বলেন, ছত্রাকজনিত গোড়া পচা রোগ কিংবা পাতায় সমস্যা দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ছত্রাকনাশক হিসেবে ম্যানকোজেব ও নন সিস্টেমিক কীটনাশক কার্বান্ডাজিম কিংবা ব্যভিস্টিন ব্যবহার করলে ভালো ফল পেতে পারেন কৃষকরা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯৩২  জন  

সর্বশেষ..