সারা বাংলা

পান নিয়ে হাইমচরে কৃষকের স্বপ্ন বুনন

বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা পান চাষের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রায় ৭০ বছর ধরে এখানে পান চাষ হচ্ছে। পানের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় নদী তীরবর্তী হাইমচরের কৃষকরা পান চাষে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি শুরু হয় এখানকার পান। এতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয় এ খাতে। পান চাষিরাও বাপ-দাদার দেখানো পথে হাঁটতে শুরু করেন। বাড়তে থাকে পানচাষি আর পানের বরজের সংখ্যা।

চাঁদপুরের রামপুর বাজার, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, শাহরাস্তি উপজেলাসহ পাশের জেলা নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে হাইমচরের পান চাষিদের পানের কদর বাড়তে থাকে। দ্রুত পানের চাহিদা বাড়তে থাকায় এ পেশায় এসে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন অসংখ্য যুবক। এভাবে চলতে থাকে যুগের পর যুগ। সেই ধারাবাহিকতায় এখন পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজার মানুষ।

তবে পান চাষ ও সফলতা অর্জনে কোনো প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় কেউই পৌঁছতে পারছেন না কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পান উৎপাদন করা গেলে দ্বিগুণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই খাত থেকে, এমনটাই জানিয়েছেন এলাকার উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকরা।

হাইমচর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর হাইমচরে ২২০ হেক্টর জমিতে পান আবাদ হয়েছে। দুই বছর আগেও পানের আবাদ হয়েছে আড়াইশো হেক্টর জমিতে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন ও উঁচু জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং ভিন্ন ফসল আবাদের কারণে পান চাষ কমেছে প্রায় ১৫ হেক্টর জমি। প্রতি হেক্টর জমিতে ২৮ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন পান উৎপাদন হয়।

বাজারে পান বিক্রি হয় বিড়া হিসেবে। ৭২টি পানে হয় এক বিড়া। ওজন দিলে হয় ২৫০ গ্রাম। প্রতি হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় এক লাখ ১৮ হাজার ৫৬০ বিড়া। ওজন হয় ২৯ দশমিক ৬৪০ মেট্রিক টন। বর্তমানে প্রতি বিড়া পান খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। কৃষকরা বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।

নলডগ চালতাপোকা মহানলি, কালিডগ, কানপাত জাতের পান চাষ হয় এ অঞ্চলে। মহজমপুর, চরকৃষ্ণপুর চরভৌরবী, আলগী উত্তর ও আলগী দক্ষিণ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পান চাষিরা পান চাষ করেন পৈতৃক সূত্রে। পান আবাদের পর গোড়া পচা, পাতা লাল ও হলুদসহ বেশ সমস্যা দেখা দেয় পানের বরজে।

উপজেলার ৩ নং দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম চরকৃষ্ণপুর গ্রামের পানচাষি আলাউদ্দিন (৩৮) জানান, বাবার রেখে যাওয়া পানের বরজ ও পান ব্যবসা ধরে রেখেছেন। প্রায় ৪০ বছর আগে পান চাষ শুরু করেন তার বাবা আবদুছ ছাত্তার গাজী। তিনি এখন প্রায় ৩৯ শতাংশ জমিতে পান চাষ করে মোটামুটি স্বাবলম্বী।

তিনি আরও জানান, পান চাষের সুবিধা হলো, বহুবর্ষজীবী হওয়ায় বারবার লাগানোর খরচ নেই। পাঁচ-ছয় দিন অন্তর পান পাতা তুলে বাজারে বিক্রি করা যায় বছরভর। বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায়  পান চাষ হলেও গুণগত মানের দিক দিয়ে চাঁদপুরের পান সেরা। যেখানে বেলে-দোঁআশ মাটি রয়েছে, সেখানেই ভালো পান হয়। মাটির পিএইচ ৭ কিংবা তার বেশি দরকার। পান বহুবর্ষজীবী হওয়ায় মাটি তৈরিতে সতর্কতা নিতে হয়। উঁচু জমিতে জল নিকাশির সুবন্দোবস্ত যেন থাকে। জমিকে ভালোভাবে চাষ দিয়ে রোদ্দুরে এক মাস ফেলে রাখতে হবে। এতে মাটিতে রোগ-জীবাণু ও আগাছার বীজ মরে যাবে। মাটি লাঙল দিয়ে বা পাওয়ার টিলারে চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চরভৌরবী এলাকার কয়েকজন পান চাষি জানান, কভিড-১৯ এর কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছেন চাষিরা। পানচাষের সঙ্গে জড়িত প্রায় তিন হাজার মালিক ও শ্রমিকদের পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ ক্ষতি থেকে পান চাষিদের ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই হাইমচরে পান চাষিদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার তাদের সহযোগিতা করবেন বলে আশা করছি।

জানা গেছে, উপজেলার কোনো পান চাষি কৃষি সেবা পায় না। তাদের কোনো প্রশিক্ষণও দেয়া হয় না। পানের রোগবালাই ও প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কেও আধুনিক কোনো ধারণা নেই এ অঞ্চলের পান চাষিদের। কোনো প্রণোদনাও নেই। পানে পচন শুরু হলে ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সব পান নষ্ট হয়ে যায়। এমন অপ্রত্যাশিত ক্ষতি থেকে বাঁচতে পান চাষিদের মাঝে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। এজন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। কৃষি অফিসের মাঠ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠে এসে পরামর্শ দেন না বলে অভিযোগও করছেন অনেক কৃষক। আবার কেউ কেউ বলছেন, পান উৎপাদনে সরকারি-বেসরকারি কোনো সহযোগিতা তারা পান না। তুলনামূলক ন্যায্যদামও পান না তারা।

হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার জানান, উপজেলায় প্রায় তিন হাজার পানচাষি এবারও ২২০ হেক্টর জমিতে পান চাষ করেছেন। এবারও পানের বাম্পার ফলন হয়েছে। পান উৎপাদন ও রপ্তানিকরণ একটি প্রকল্প রয়েছে, সে প্রকল্পের মাধ্যমে পান রপ্তানি করা হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..