মত-বিশ্লেষণ

পারিবারিক কলহ শিশুস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

সাঈদ চৌধুরী: সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যে বিষয়গুলো দূর করা প্রয়োজন তা হলো পারিবারিক কলহ। পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর কলহ আলাদা হওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে। দেখা যায়, সামান্য বোঝাপড়ার অভাব এবং নিজেকে সঠিকভাবে পরিবারে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারার ব্যর্থতার কারণেই পরিবারপ্রথা ভাঙছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ব্রোকেন ফ্যামিলি, সিঙ্গেল মাদার বা সিঙ্গেল ফাদার শব্দগুলো ধীরে ধীরে সমাজে পরিচিতি লাভ করছে। আর এ শব্দগুলো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য, পরিবারের সন্তানগুলো খুব একা হয়ে যাচ্ছে, বখে যাচ্ছে, অথবা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আর এর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে ওপরে উল্লেখ করা শব্দগুলো।
মৌসুমি (মূলনাম নয়) ১২-১৩ বছর বয়সি একটি মেয়ে। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় তার বাড়ি। গত এক দেড় বছর আগেও মেয়েটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। ছোটবেলা থেকেই আবেগপ্রবণ মেয়েটি বাবাকে ছাড়া কোনো কিছুই বুঝত না। যেখানেই যেত, বাবাকে নিয়ে যেত এবং বাবাকে না দেখলেই কাঁদতো। খুব গরিব ঘরের মেয়েটির মায়ের অভাবও সহ্য হয়নি। এই আবেগপ্রবণ মেয়েটিকে রেখেই মা সিদ্ধান্ত নেয় চাকরি করবেন। বাড়ি থেকে পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরে গিয়ে মা চাকরি করায় আরও বেশি একা হয়ে পড়ে মেয়েটি। ফলে একসময় দেখা দেয় তার মানসিক সমস্যা। মেয়েটি আস্তে আস্তে একেবারে শিশুদের মতো আচরণ করতে থাকে। ১২-১৩ বছরের কিশোরী মেয়েটি এখন গায়ে কাপড় রাখতে চায় না, ঘরের ভেতরই প্রস্রাব করে দেয়, বাবার কোলে উঠে বসে থাকে!
একদিকে মেয়ের অসুস্থতা, আরেক দিকে দারিদ্র্য। সংসার চালাতে মাকে দূরে কাজে যেতেই হচ্ছে। যেটুকু সময় মেয়ে কাছে পায়, পাগলের মতো আঁকড়ে থাকে মাকে। কোনোভাবেই মেয়েটি মাকে কাছছাড়া করতে চায় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন মেয়েটি আরও অসুস্থ। সমাজ সেবা অধিদফতরের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে মেয়েটিকে। কিন্তু মা যদি মেয়ের সঙ্গে না থাকে, সেক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ওষুধ দেওয়ার সময় চিকিৎসক আরও বলেছেন, মৌসুমির বাবা-মা একসঙ্গে না থাকলে ওর সমস্যার সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে।
মৌসুমিদের জন্য শঙ্কা থেকেই যায় এ সমাজে। কারণ এক মৌসুমি সমাজের ভেঙে যাওয়া বিভিন্ন পরিবারের প্রতিচ্ছবি। যে পরিবারগুলো ভাঙছে এবং যে পরিবারে সন্তান আছে, সে পরিবারের সন্তানেরাই এমন মানসিক অসুস্থতা নিয়ে বড় হচ্ছে। যারাই এমনভাবে বড় হচ্ছে, তারা প্রত্যেকেই জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলোকে এমনভাবে দেখছে যে, তারা অনেক সময় জীবনের প্রতিও মায়া ও ভালোবাসা হারিয়ে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। আত্মহত্যাকারী বিভিন্ন মানুষের ব্যাপারে জরিপ চালালে দেখা যাবে, একসময় হয়তো তাদের পরিবারে কখনও কলহের আধিপত্য ছিল।
আজকের সময়ে কিশোর অপরাধের এত যে বিস্তৃতি, এর পেছনে সামাজিক বিভিন্ন অনুষঙ্গের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রয়েছে পারিবারিক কলহের। যখন কোনো শিশু ঘরে এসে দেখে তার বাবা-মা শান্তিতে নেই, তখন তারাও অনিরাপদ ও অস্বস্তি বোধ করে এবং ঘরের বাইরে অথবা একাকী সময় কাটাতে চায়। আর এর ফলেই একসময় সে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।
সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে পারিবারিক কলহ কমিয়ে আনার জন্য বাবা-মায়ের উচিত যতœশীল হওয়া। সাংসারিক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা থাকলে স্পষ্টভাবে তার ফলপ্রসূ প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। সামাজিক উন্নয়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন পরিবারপ্রথার স্থিতিশীলতা। যদি স্থীতিশীল পরিবার নিশ্চিত করা যায়, তবে অনেক সামাজিক সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব হবে সহজেই। কিশোর অপরাধ কমবে এবং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটবে। পরিবারে শান্তি নিশ্চিত করতে পারলে তা সুদূরপ্রসারী ফল দেবে।
মৌসুমিদের মতো মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য তার বাবা-মায়ের একসঙ্গে থাকা নিশ্চিত করতে আমাদের যেমন কাজ করতে হবে, তেমনি কাজ করতে হবে তাদের দারিদ্র্যবিষয়ক সমস্যা সমাধানেরও। মহিলাবিষয়ক অধিদফতর ও সমাজসেবা অধিদফতরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আমাদের সবার সচেতন হতে হবে, সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সবার সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এক্ষেত্রে আবশ্যক।
সরকারের পক্ষ থেকে সমাজসেবা অধিদফতর সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা, কিছু ক্ষেত্রে আইনি সেবা এবং সামাজিক সেবাসহ অন্যান্য সেবা পৌঁছে দিয়েছে। বাল্যবিয়ে রোধ ও কিশোর স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানেও এগিয়ে আসছে সমাজসেবা অধিদফতর, পাশে দাঁড়াচ্ছে প্রবীণ, অসহায় বিধবাসহ অসহায় মানুষদেরও।
নারীদের কর্মসংস্থানে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর ভালো ভূমিকা রাখছে। অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, সেলাই মেশিন বিতরণ করছে এবং নারীকৃষি নিয়ে কাজ করছে। শিশুদের রেখে নারীরা যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে, সে নিশ্চয়তা প্রদানেও কাজ করছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ইউনিসেফ, ইউএনডিপি’র মতো বড় এনজিওগুলোও এ কাজে সরকারকে সহযোগিতা করছে। মূলত এ কাজগুলোকেই একীভূত করে সরকারসহ সরকারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তা করতে হবে পারিবারিক বিভিন্ন ধরনের সমস্যাকে চিহ্নিত করে সেগুলোর ব্যপারে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করা। শিশুদেরও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তবেই নারী-শিশুর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য, কিশোর অপরাধসহ অন্যান্য সমস্যা কিছুটা হলেও কমে আসবে।
আশা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট মহল পারিবারিক কলহ নিরসনে আরও সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..